টাইম স্কয়ারের দিকে যাত্রা: ক্ষুধা এবং কৌতূহলের মিশেল
মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্ট থেকে বেরিয়ে সিক্সথ অ্যাভিনিউ ধরে সোজা হাঁটা শুরু করি আমরা। গন্তব্য টাইম স্কয়ার। গুগল ম্যাপ নির্দেশ দিচ্ছে, সেভেন্থ অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে বাঁদিকে মোড় নিলেই পৌঁছে যাব। কিন্তু পথেই পেটের চোঁ চোঁ শব্দ শুরু হয়ে গেছে। কিছু না খেলে টাইম স্কয়ারের আনন্দ ম্লান হয়ে যাবে নিশ্চিত। সেরীনকে নিউইয়র্কের স্ট্রিট ফুড টেস্ট করার প্রস্তাব দিলাম, কিন্তু সে পাত্তা দিল না। আশেপাশের রাস্তায় অসংখ্য স্ট্রিট ফুড ভেন্ডর, প্রতিটির সামনে লম্বা লাইন। নিউইয়র্ক আসার আগে-পরে কতজনই না এই স্ট্রিট ফুড খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন! নতুন খাবারে সেরীনের আগ্রহ প্রবল, কিন্তু আমার জন্য সেটা একটু সমস্যাজনক।
ভ্রমণের স্মৃতি এবং খাবারের পছন্দ
ঢাকায় বিয়ের পর আমরা প্রায়ই ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরতে যেতাম—দার্জিলিং, শিলং, কলকাতা থেকে দিল্লি বা আগ্রা। সড়কপথে কম খরচে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ মিলত। ভারতের প্রতিটি অঞ্চলের খাবারের ধরন আলাদা, সেরীনের নজর থাকত স্থানীয় বিশেষ খাবারের দিকে, আর আমি খুঁজতাম পরিচিত কিছু। সেই স্মৃতিই কি এখন সেরীনকে স্ট্রিট ফুডের দিকে আকর্ষণ করছে? আশেপাশে ম্যাকডোনাল্ডসের সাইন দেখে আমি সেখানে যাওয়ার প্রস্তাব দিলাম, এবং আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। সময় স্বল্পতা এবং দীর্ঘ লাইনের কারণে বেশ কয়েকটি ভেন্ডর পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম।
টাইম স্কয়ারের আবিষ্কার: একটি বিশ্ব বিস্ময়
ম্যাকডোনাল্ডস থেকে বেরিয়ে রাস্তায় মানুষের স্রোত দেখে অবাক হলাম। জনস্রোতের সঙ্গে মিশে সামনে এগোতে থাকি, এখানে-সেখানে জটলা পাকিয়ে মানুষ কী যেন দেখছে। রাস্তার মাঝখানে একটি মঞ্চের মতো স্থান, যদিও সেখানে তখন কিছুই ঘটছিল না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, আমরা টাইম স্কয়ারে পৌঁছে গেছি। আহা! এই সেই টাইম স্কয়ার! চারপাশে আকাশছোঁয়া বিশাল আলোকিত বিলবোর্ড চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল। দিনের বেলার এই ঝলমলে দৃশ্য থেকে রাতের আলোকসজ্জার জীবন্ততা অনুমান করা যায়। আমরা বিস্ময়ে ভরা চোখে টাইম স্কয়ারের বৈচিত্র্য উপভোগ করতে লাগলাম।
টাইম স্কয়ারের জনপ্রিয়তা এবং ইতিহাস
টাইম স্কয়ার, বা 'ক্রসরোডস অব দ্য ওয়ার্ল্ড', সত্যিই এক বিস্ময়কর স্থান। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এখানে ভিড় জমায়, সময় কাটায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটক এবং আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বাসিন্দারা পরিবার নিয়ে এখানে আসেন। বছরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন দর্শনার্থী টাইম স্কয়ার দেখতে আসেন, এটি একটি প্রধান পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ইংরেজি নববর্ষের বল ড্রপ অনুষ্ঠান বিশ্বব্যাপী বিখ্যাত, কিন্তু প্রতিদিনের এই ভিড়ের কারণ কী? ১৮০০-এর দশকের শেষে 'লংঅ্যাকর স্কয়ার' নামে পরিচিত এই এলাকা ঘোড়ার গাড়ির পণ্যবাহী কেন্দ্র ছিল। ক্রমে লোকসমাগম বাড়ে এবং বড় অট্টালিকা গড়ে ওঠে, যা আজকের টাইম স্কয়ারে রূপান্তরিত হয়।
নিউইয়র্ক টাইমসের ভূমিকা এবং উন্নয়ন
১৯০৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমসের প্রকাশক অ্যাডলফ ওকস পত্রিকার অফিস ৪২তম স্ট্রিটের একটি ২৫ তলা ভবনে স্থানান্তর করেন, এবং তখন থেকেই এলাকাটি 'টাইম স্কয়ার' নামে পরিচিতি পায়। একই বছর সাবওয়ে স্টেশন চালু হলে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটে, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনোদন কার্যক্রম বিস্তৃত হয়। ১৯৬০-৭০-এর দশকে অপরাধপ্রবণ হয়ে পড়লেও, ১৯৮০-৯০-এর দশকে মেয়র রুডি জিউলিয়ানির উদ্যোগ এবং ডিজনি কোম্পানির বিনিয়োগে টাইম স্কয়ার আবার নিরাপদ ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
টাইম স্কয়ারের বর্তমান: আলো এবং বিনোদনের সমাহার
টাইম স্কয়ারের ভিড়ে নিজেদের মিশিয়ে দিলাম আমরা। দুই পাশের বিলবোর্ডে বহুজাতিক কোম্পানির বিজ্ঞাপন, মনে হচ্ছিল হার্ট থ্রব মুভির দৃশ্য। নিয়ন বাতির ঝলকানি মোহনীয়, একটি বিশাল ইন্টারেক্টিভ বিলবোর্ড—ব্রডওয়ে থেকে ৪৫তম ও ৪৬তম স্ট্রিটজুড়ে প্রায় ১০০ মিটার দীর্ঘ—চোখ ঝলসে দেয়। ১৯২০-এর দশক থেকে এই আলোকসজ্জার tradition চলে আসছে। ব্রডওয়ে থিয়েটারের কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে, এবং স্ট্রিট পারফরমারদের নৈপুণ্য দর্শকদের মোহিত করে।
একটি হ্যালোইনের ডিজিটাল মোড়
এক জায়গায় ভিড় দেখে এগিয়ে গেলাম, হ্যালোইনের সাজে কয়েকজন তরুণ-তরুণী, কিন্তু তারা সেজেছে ডিজিটাল চরিত্রে—স্পাইডার ম্যান, সুপারম্যান, রোবট। এরা কি হ্যালোইনের ডিজিলাইজেশন করে ফেলল? ছবি তুলতে গেলে এক চরিত্র বলল, 'দিস ইজ আওয়ার বিজনেস, ফটো উইথ পেমেন্ট অনলি।' আমি ক্ষমা চেয়ে সরে এলাম, দেখলাম অনেকে লাইন দিয়ে তাদের সঙ্গে ছবি তুলছেন। 'বেস্ট অব লাক উইথ ইউর বিজনসে' বলে আমরা সাবওয়ে স্টেশনের দিকে এগোতে লাগলাম, জ্যাকসন হাইটসে আনোয়ার শাহাদাতের অপেক্ষায়।
