নবীজির (সা.) দিদার পেতে উম্মতের অদম্য তৃষ্ণা
মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ সৌভাগ্য ছিল সেই মানুষদের, যারা আল্লাহর প্রিয়তম হাবীব, মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তারা ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম (রা.)— যাদের চোখে ধরা দিয়েছিল নবুয়তের আলো, যাদের কানে পৌঁছেছিল ওহির ব্যাখ্যা, যাদের হৃদয় আলোকিত হয়েছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্নেহ, দয়া ও ভালোবাসায়।
আজ, চৌদ্দশত বছরেরও বেশি সময় পরে আমরা তার উম্মত হিসেবে বেঁচে আছি; কিন্তু তাকে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। তাই যখন সাহাবিদের কথা স্মরণ করি, তখন হৃদয়ের গভীর থেকে এক ধরনের ঈর্ষা, হাহাকার ও ভালোবাসা জেগে ওঠে। সেই ঈর্ষা দুনিয়াবি নয়; বরং প্রিয় নবী (সা.)-এর সান্নিধ্য না পাওয়ার ব্যথা থেকে উৎসারিত এক পবিত্র অনুভূতি।
সাহাবিদের প্রতি ঈর্ষা—এক ভালোবাসার নাম
ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আপনার প্রিয় সাহাবিদের প্রতি আমার বড্ড ঈর্ষা জাগে। তারা কতই না সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন! তারা আপনার পাশে হেঁটেছেন, আপনার কথা শুনেছেন, আপনার হাসি দেখেছেন, আপনার দোয়া পেয়েছেন। তারা কতই না ধন্য—যাদের চোখ দেখেছিল আপনার নূরানী চেহারা মোবারক। তারা কতই না ভাগ্যবান—যাদের কানে পৌঁছেছিল আপনার সুমিষ্ট কণ্ঠস্বর। তারা কতই না সৌভাগ্যশালী—যারা আপনার সঙ্গে নামাজ আদায় করেছেন, আপনার পেছনে দাঁড়িয়ে তাকবির বলেছেন, আপনার কাছ থেকে সরাসরি দ্বীনের শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। আমরা তাদের কথা পড়ি, তাদের জীবন নিয়ে আলোচনা করি, তাদের ভালোবাসি; কিন্তু তারা তো আপনাকে নিজের চোখে দেখেছিলেন! এ তুলনা কি কখনো সম্ভব?
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ
আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘নবী মুমিনদের নিকট তাদের নিজেদের থেকেও অধিক ঘনিষ্ঠ ও অগ্রগণ্য।’ (সুরা আল-আহযাব: আয়াত ৬) এই আয়াত আমাদের শিক্ষা দেয় যে, একজন মুমিনের হৃদয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মর্যাদা নিজের জীবন, সম্পদ ও স্বার্থের চেয়েও ঊর্ধ্বে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘তোমাদের কেউ পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, সন্তান এবং সমগ্র মানবজাতির চেয়েও অধিক প্রিয় হই।’ (বুখারি ১৫) সুতরাং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি গভীর ভালোবাসা, তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা এবং তার যুগে জন্ম নিতে না পারার আক্ষেপ—এসব ইমানি অনুভূতিরই বহিঃপ্রকাশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কি তার পরবর্তী উম্মতদের কথা জানতেন?
হ্যাঁ, তিনি তার সেই উম্মতের কথা বলেছেন, যারা তাকে না দেখেও ভালোবাসবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘আমি আমার ভাইদের দেখতে চাই।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমরা কি আপনার ভাই নই?’ তিনি বললেন— ‘তোমরা আমার সাহাবি। আর আমার ভাই হলো তারা, যারা এখনও আসেনি (অর্থাৎ পরবর্তী যুগের মুমিনগণ)।’ (মুসলিম ২৪৯) কী অপার সৌভাগ্য! যাকে আমরা দেখিনি, তিনি আমাদের কথা বলেছেন; যার যুগে আমরা জন্মাইনি, তিনি আমাদেরকে তার ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেছেন।
দিদারের আকুলতা—এক মুমিন হৃদয়ের আর্তনাদ
ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)! আপনার এই গুনাহগার উম্মতরাও যে বড্ড তৃষ্ণার্ত আপনার দিদার পেতে—আপনি কি তা জানেন? আমরা আপনার পদচিহ্ন খুঁজে ফিরি ইতিহাসের পাতায়। আমরা আপনার সুন্নাহ অনুসরণ করার চেষ্টা করি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে। আমরা আপনার নাম শুনলে দরুদ পাঠ করি। আমরা আপনার ভালোবাসায় অশ্রুসিক্ত হই। আমরা জানি, দুনিয়াতে আপনাকে দেখার সুযোগ নেই; কিন্তু আমরা আশাবাদী, আল্লাহ তাআলা যদি দয়া করেন, তাহলে হাশরের ময়দানে আপনার পতাকার নিচে সমবেত হবো, আপনার হাউজে কাওসার থেকে পান করবো এবং জান্নাতে আপনার সান্নিধ্য লাভ করবো।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নৈকট্য লাভের পথ
আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ কর; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ৩১) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রকৃত ভালোবাসা কেবল আবেগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার সুন্নাহ অনুসরণ, তার আদর্শ বাস্তবায়ন এবং তার শিক্ষা অনুযায়ী জীবন গড়ার মধ্যেই তার নৈকট্য লাভের পথ নিহিত। সাহাবিদের প্রতি আমাদের ঈর্ষা আসলে তাদের প্রাপ্ত সেই অমূল্য সম্পদের প্রতি— যার নাম রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্য। আমরা তাকে দেখিনি, তার কণ্ঠ শুনিনি, তার যুগে বাস করিনি; তবুও আমাদের হৃদয় তার ভালোবাসায় স্পন্দিত হয়।
হে আল্লাহ! আমাদের অন্তরে আপনার হাবীব মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্যিকারের ভালোবাসা দান করুন। তার সুন্নাহর ওপর অটল রাখুন। হাশরের ময়দানে তার শাফাআত নসিব করুন এবং জান্নাতে তার সান্নিধ্যে আমাদের সমবেত করুন। ‘হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত হোক।’ আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়িদিনা মুহাম্মাদ।



