ছবি: পেক্সেলস
আমরা ইসলাম বলতে বর্তমানে শুধু একটা নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয় ও চর্চা বুঝে থাকি। এটা অবশ্য ভুল নয়, তবে খণ্ডিত একটি ধারণা। এর আরও প্রাচীন, বিস্তৃত ও বৃহত্তর পরিচয় আছে।
ইসলামের সার্বজনীনতা
ইসলাম একটা সর্বজনীন ধারণা ও দর্শন। যার সারমর্ম—সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর একত্ববাদ, আনুগত্য এবং তাঁর দেওয়া ধর্মনীতির প্রতি আস্থা। কোরআন ইসলামের ধারণাকে তুলে ধরেছে শিরক বা স্রষ্টার অংশীদারত্ব ধারণার বিপরীত হিসেবে।
বলা হয়েছে, “বলুন, আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করব? যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর স্রষ্টা এবং যিনি (সবাইকে) খাদ্য দান করেন, কারও থেকে খাদ্য গ্রহণ করেন না? বলে দাও, আমাকে আদেশ করা হয়েছে যেন ইসলাম পালনকারীদের মধ্যে আমিই প্রথম ব্যক্তি হই এবং (আমাকে বলা হয়েছে) তুমি কিছুতেই মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সুরা আনআম, আয়াত: ১৪)
‘ইসলাম’ শব্দটি যদি আনুগত্য, একত্ববাদ ও বিশ্বাসের ক্রিয়াবাচক শব্দ হয়, তবে ‘মুসলিম’ শব্দটি হলো ইসলাম শব্দের কর্তাবাচক রূপ। এর অর্থ আনুগত্যশীল, বিশ্বাসী ও একত্ববাদী। যুগে যুগে নবী-রাসুলেরা নিজেদের মুসলিম হিসেবে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন।
নবীদের ভাষ্যে ইসলাম
আর তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসুল আমি পাঠাইনি যার প্রতি আমি এই ওহি নাজিল করিনি যে ‘আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো’। (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৫)
নবী নুহ (আ.) আপন জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “আর আমাকে বিধান দেওয়া হয়েছে, আমি যেন মুসলিমদের মধ্যে শামিল থাকি।” (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৩২)
আরবের বহু-ঈশ্বরবাদীরা দাবি করত, তারা নবী ইব্রাহিমের ধর্ম পালন করে। সেই দাবির খণ্ডন করে ইব্রাহিম (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “তার প্রতিপালক যখন তাকে বলেছিলেন, ‘তুমি ইসলাম গ্রহণ করো’, উত্তরে সে বলল, ‘আমি সারা জগতের প্রতিপালকের কাছে ইসলাম গ্রহণ করলাম’।” (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৩১)
নানা দুর্দশা ও বিপদ কাটিয়ে মিসরে রাজ্যাভিষেকের পর ইউসুফ (আ.) যখন জীবনের সফলতা ও নেতৃত্বের চূড়ান্ত সময়ে, তখন তাঁর সম্মানে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিলেন তাঁর মা-বাবা ও ভাইয়েরা। সেই আনন্দঘন পুনর্মিলনীতে তিনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতায় ঋজু হয়েছিলেন; কামনা করেছিলেন আমৃত্যু মুসলিম হিসেবে বেঁচে থাকার।
আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, “হে আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে রাজত্ব দান করেছ আর আমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিখিয়েছ। আসমান-জমিনের সৃষ্টিকর্তা, তুমিই দুনিয়ায় আর আখিরাতে আমার অভিভাবক, তুমি মুসলিম অবস্থায় আমার মৃত্যু দান করো এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করো।” (সুরা ইউসুফ, আয়াত: ১০১)
ফেরাউনের দরবারে দক্ষ জাদুকরদের ওপর মোজেজার মাধ্যমে বিজয়ী হওয়ার পরও যখন নির্যাতনের ভয়ে অল্প কয়েকজন ছাড়া কেউ নবী মুসা (আ.)-এর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করছিল না, তখন অভয় দিয়ে মুসা তাদের লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “হে আমার জাতির লোকেরা, তোমরা যদি আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে থাকো, তবে তোমরা তাঁরই ওপর ভরসা করো, যদি তোমরা মুসলিম হয়ে থাকো।” (সুরা ইউনুস, আয়াত: ৮৪)
নবী ইসা (আ.)-এর ঘটনায় কোরআনে এসেছে, “যখন ইসা তাদের অবিশ্বাস অনুভব করল, তখন বলল, ‘কেউ আছে কি যে আল্লাহর পথে আমার সহায়ক হবে?’ হাওয়ারিগণ (নিকট শিষ্যগণ) বলল, ‘আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী, আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং সাক্ষী থাকুন যে নিশ্চয়ই আমরা মুসলিম’।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫২)
এই প্রাচীন ইসলামের সিলসিলায় শেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসেবে মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে আল্লাহ ওহি প্রেরণ করেছেন।
এজন্যই তাঁকে সম্বোধন করে আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি প্রত্যাদেশ করেছি, যেমন আমি নুহ ও পরবর্তী নবীদের প্রতি প্রত্যাদেশ করেছিলাম এবং ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তার বংশধরদের প্রতি এবং ইসা, আইয়ুব, ইউনুস, হারুন, সোলাইমানের প্রতি প্রত্যাদেশ করেছিলাম এবং আমি দাউদকে জাবুর প্রদান করেছিলাম।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৬৩)
ধর্মে বিভক্তি কেন?
আরও পড়ুন
সভ্যতা রক্ষা ও বিপর্যয় রোধে কোরআনের অনন্য দর্শন
০২ জুন ২০২৬
ধর্মে ধর্মে মতভেদের নেপথ্যে এই প্রেক্ষিতে পাঠকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে যদি সব নবীর বিশ্বাস, ধর্মচর্চা ও ধারাবাহিকতা ইসলাম হিসেবে গণ্য হয়, তবে তাদের ধর্মের মাঝে এত বিভক্তি ও মতানৈক্য কেন?
এর উত্তর কোরআনেই মেলে। ধর্মে ধর্মে পার্থক্যের কারণ বুঝতে গেলে ধর্মের ভেতরের দুটি ধারা সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে: ১. মৌলিক বিশ্বাস, আকিদা ও চিরন্তন ফিতরত এবং ২. আনুষঙ্গিক চর্চা, শরিয়ত ও পরিবর্তনশীল বিধি-বিধান।
প্রথম প্রকার সম্পর্কেই কোরআন আমাদের জানায়, আল্লাহ সব রাসুলকেই একত্ববাদ ও আনুগত্যের বার্তা দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, “আর তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসুল আমি পাঠাইনি যার প্রতি আমি এই ওহি নাজিল করিনি যে ‘আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো’।” (সুরা আম্বিয়া, আয়াত: ২৫)
ধর্মে ধর্মে মৌলিক বিশ্বাস ও দর্শনের মধ্যে যে বিভেদ দেখা যায়, সেটা খোদাপ্রদত্ত কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পার্থক্য নয়; বরং মানবসৃষ্ট, আরোপিত এবং নিজেদের অহংকার, হিংসা ও ধর্মগ্রন্থ বিকৃতির ফলাফল।
কাফেরদের নিকট ব্যাপারটা কঠিন মনে হলেও রাসুলকে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বিশুদ্ধ একত্ববাদের আহ্বান জানাতে।
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য ধর্মের সেই নীতি-ব্যবস্থাই দিয়েছেন যার হুকুম তিনি দিয়েছিলেন নূহকে। আর সেটাই তোমাকে ওহির মাধ্যমে দিলাম যার হুকুম দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মুসা ও ঈসাকে, তা এই যে, তোমরা ধর্ম প্রতিষ্ঠিত করো আর তাতে বিভক্তি সৃষ্টি কোরো না। তুমি মুশরিকদের যার প্রতি আহ্বান করছ, তা তাদের নিকট দুর্বহ মনে হয়।” (সুরা শুরা, আয়াত: ১৩)
কাফেরদের নিকট ব্যাপারটা কঠিন মনে হলেও রাসুলকে আল্লাহ আদেশ দিয়েছেন ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের বিশুদ্ধ একত্ববাদের আহ্বান জানাতে। তিনি বলেন, “বল, ‘হে আহলে কিতাব, এমন এক কথার দিকে এসো, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; তা এই যে, আমরা আল্লাহ ভিন্ন অন্য কারও ইবাদত করব না এবং কোনো কিছুকে তাঁর শরিক করব না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে আমাদের মধ্যে কেউ কাউকে রব হিসেবে গ্রহণ করব না।’ তারপরও যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলে দাও, ‘তোমরা এ বিষয়ে সাক্ষী থাক যে আমরা মুসলিম’।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৬৪)
পরিবর্তনশীল শরিয়ত ও কর্মপথ
ধর্মে ধর্মে পার্থক্য ও ভিন্নতার দ্বিতীয় প্রকারটি হলো আনুষঙ্গিক বিধি-বিধানের পার্থক্য; যা শাশ্বত ও কালোত্তীর্ণ নয়, বরং সাময়িক, পারিপার্শ্বিক ও পরিবর্তনশীল। এটা আল্লাহ-প্রদত্ত। আল্লাহ যুগে যুগে মানবজাতির চেতনা ও সভ্যতার বিকাশ অনুযায়ী বিভিন্ন বিধান বা শরিয়ত দিয়েছেন।
নবী আদম (আ.)-এর যুগে মানববংশ বৃদ্ধির জন্য যে পারিবারিক বা বিয়ের নিয়ম ছিল, নবী মুসার যুগে তা ছিল না। মুসার জাতির জন্য তাদের স্বভাব-প্রকৃতি অনুযায়ী বিভিন্ন বিধি-বিধানে কঠোরতা আনা হয়েছিল। পরবর্তীকালে নবী ইসার যুগে বনি ইসরাইলের জন্য আগের কিছু কঠিন নিয়ম শিথিল করা হয়।
আরও পড়ুন
কেয়ামতের আগে পৃথিবী যেভাবে বদলে যাবে
০৩ এপ্রিল ২০২৬
ধর্মের এই প্রকারের দিকে ইঙ্গিত করেই ইসা (আ.) তাঁর জাতিকে লক্ষ্য করে বলেছেন, “এবং আমি এসেছি আমার পূর্বে তাওরাতে যা ছিল তার সত্যতা প্রদান করতে এবং তোমাদের জন্য যা অবৈধ হয়েছে তার কতিপয় তোমাদের জন্য বৈধ করতে আর তোমাদের রবের নিকট হতে তোমাদের জন্য নিদর্শন নিয়ে; অতএব আল্লাহকে ভয় করো ও আমার অনুগত হও।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ৫০)
আরেকটি আয়াতে ওপরের দুই প্রকার বিভিন্নতা সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন, “আর আমি সত্য বিধানসহ তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক। কাজেই মানুষদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করো আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তদনুসারে, আর তোমার কাছে যে সত্যবিধান এসেছে তা ছেড়ে দিয়ে তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ কোরো না। আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য একটি শরিয়ত ও একটি কর্মপথ নির্ধারণ করেছি। আল্লাহ ইচ্ছে করলে তোমাদের এক জাতি করতেন। কিন্তু তিনি তোমাদের যা দিয়েছেন, সেই ব্যাপারে তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে চান। কাজেই তোমরা সৎকর্মে অগ্রগামী হও, তোমাদের সকলের প্রত্যাবর্তন আল্লাহর দিকেই। অতঃপর তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করছিলে, সে সম্বন্ধে তিনি তোমাদের অবহিত করবেন।” (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৪৮)
ধর্মে ধর্মে মৌলিক বিশ্বাস ও দর্শনের মধ্যে যে বিভেদ দেখা যায়, সেটা খোদাপ্রদত্ত কোনো স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পার্থক্য নয়; বরং মানবসৃষ্ট, আরোপিত এবং নিজেদের অহংকার, হিংসা ও ধর্মগ্রন্থ বিকৃতির ফলাফল। এই আয়াতের শুরুতে আনুষঙ্গিক চর্চা, শরিয়ত ও পরিবর্তনশীল বিধি-বিধানের কথা বলা হয়েছে; যা আল্লাহর পক্ষ থেকে একটা পরীক্ষা যে মানুষ পরিবর্তনশীল বিধি-বিধান সাদরে গ্রহণ করে, নাকি পূর্ববর্তীদের অন্ধ অনুগত বা আরামপ্রিয় জীবনের দাস হয়ে থাকে। আর আয়াতের শেষে মৌলিক বিশ্বাস ও আকিদার ক্ষেত্রে মানবসৃষ্ট মতভেদের কথা বলা হয়েছে। এই মতভেদ সম্পর্কে পরকালে আল্লাহর কাছে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
শেষ কথা
কোরআন আমাদের সামনে ধর্মের যুগ যুগের একক সিলসিলার যে চিত্র তুলে ধরে, তাতে স্পষ্ট হয়—ইসলাম শুধু চৌদ্দশত বছর আগে অবতীর্ণ কোনো নতুন ধর্মের নাম নয়, বরং সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে চলে আসা স্রষ্টার পক্ষ থেকে একমাত্র শাশ্বত জীবনদর্শন।
যুগে যুগে দেশে দেশে মানুষ যখনই আল্লাহর একত্ববাদ ও মৌলিক বিশ্বাস থেকে দূরে সরে গেছে, তখনই কোনো না কোনো নবী-রাসুল এসে মানুষকে আবার সেই আদি ও অকৃত্রিম ইসলামের দিকে আহ্বান করেছেন।
ইতিহাসের পরিক্রমায় আজ হয়তো বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, বিধি-বিধানের পার্থক্য এবং মৌলিক বিশ্বাসে বিকৃতির কারণে মানবজাতি বিভিন্ন ধর্মে বিভক্ত; কিন্তু সব আসমানি ধর্মের মৌলিক বিশ্বাস ও পরম সত্যের সিলসিলা আসলে একই সূত্রে গাঁথা। এই সত্যকে সংকীর্ণ গোষ্ঠীগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে অনুধাবন করতে পারলেই মানবতার সর্বজনীন মুক্তি সম্ভব।
[email protected]
আবদুল্লাহিল বাকি : আলেম, লেখক ও সফটওয়্যার প্রোগ্রামার
আরও পড়ুন
বদর যুদ্ধের নেপথ্যে: রহস্যময় কিছু স্বপ্ন ও তার ব্যাখ্যা
৪ ঘণ্টা আগে
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
ইসলাম থেকে আরও পড়ুন
নবীজি (সা.)
ইসলামের কথা
ইসলাম
নবীদের কাহিনী
কোরআন
ধর্ম



