আরবি ১২ মাসের নামের অর্থ ও নামকরণের ইতিহাস: মুহাররম থেকে জিলহজ
আরবি মাসের নামের অর্থ ও ইতিহাস: মুহাররম থেকে জিলহজ

হিজরি বর্ষপঞ্জির গুরুত্ব ও নামকরণের প্রেক্ষাপট

মানবজীবনে সময়ের সঠিক হিসাব রাখা সভ্যতার অন্যতম ভিত্তি। ইসলামে হিজরি বর্ষপঞ্জির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে, কারণ রোজা, হজ, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, আশুরাসহ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান এই চান্দ্রবর্ষের ওপর নির্ভরশীল। মুসলমানদের জন্য হিজরি মাস ও তারিখ সম্পর্কে জ্ঞান রাখা ফরজে কিফায়ার অন্তর্ভুক্ত একটি দায়িত্ব।

ইসলামের আবির্ভাবের বহু আগে থেকেই আরব উপদ্বীপে চান্দ্রবর্ষ প্রচলিত ছিল, তবে বিভিন্ন গোত্র নিজেদের সুবিধামতো মাসের ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করত। পরবর্তীতে আরবদের পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ১২টি মাসের বর্তমান নাম নির্ধারণ করা হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, পঞ্চম শতাব্দীতে কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট নেতা কিলাব ইবনে মুররা এই নামগুলোকে সুসংহত ও সর্বজনগ্রাহ্য করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

আরবি ১২ মাসের নামের অর্থ ও নামকরণের ইতিহাস

১. মুহাররম: শব্দের অর্থ নিষিদ্ধ, মর্যাদাপূর্ণ বা সম্মানিত। জাহেলি যুগে এই মাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত ও প্রতিশোধ গ্রহণ নিষিদ্ধ মনে করা হতো। মাসটির বিশেষ মর্যাদার কারণেই এর নাম রাখা হয় মুহাররম।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

২. সফর: অর্থ খালি বা শূন্য। মহররমে যুদ্ধ বন্ধ থাকার পর আরবরা এই মাসে যুদ্ধ, ব্যবসা ও ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ত, ফলে বসতিগুলো প্রায় জনশূন্য হয়ে যেত।

৩. রবিউল আউয়াল: 'রবি' অর্থ বসন্ত, 'আউয়াল' অর্থ প্রথম। নামকরণের সময় মাসটি বসন্ত ঋতুর শুরুতে পড়েছিল।

৪. রবিউল আখির: 'আখির' অর্থ শেষ। বসন্ত ঋতুর শেষাংশে অবস্থান করায় এ মাসের নাম রাখা হয় রবিউল আখির, যা রবিউস সানি নামেও পরিচিত।

৫. জুমাদাল উলা: 'জুমাদা' এসেছে জুমুদ থেকে, যার অর্থ জমে যাওয়া। নামকরণের সময় প্রচণ্ড শীতকাল ছিল, তীব্র ঠান্ডায় পানি জমে যেত।

৬. জুমাদাল আখিরা: 'আখিরা' অর্থ শেষ। শীত ঋতুর শেষভাগে এই মাস অবস্থান করত।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

৭. রজব: অর্থ সম্মান করা। এটি ইসলামের চারটি সম্মানিত মাসের একটি। জাহেলি যুগেও এ মাসে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকা হতো।

৮. শাবান: অর্থ ছড়িয়ে পড়া। রজব মাস শেষে আরবরা জীবিকা, পানি ও যুদ্ধের প্রয়োজনে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ত।

৯. রমজান: 'রমজা' ধাতু থেকে এসেছে, অর্থ প্রচণ্ড উত্তাপ। নামকরণের সময় গ্রীষ্মকালে পড়েছিল। ইসলামী ব্যাখ্যায় রোজা ও ইবাদতের মাধ্যমে গুনাহ দগ্ধ হয় বলে এর নাম রমজান।

১০. শাওয়াল: অর্থ উত্থিত হওয়া। এ মাসে আরবরা শিকার ও ভ্রমণের প্রস্তুতি নিত এবং অস্ত্র কাঁধে তুলে যাত্রা করত।

১১. জিলকদ: অর্থ বসে থাকা। এই মাসে আরবরা যুদ্ধ ও দীর্ঘ ভ্রমণ থেকে বিরত থেকে নিজ ঘরে অবস্থান করত।

১২. জিলহজ: অর্থ হজের মাস। ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই এ মাসে কাবাঘরে হজ পালনের জন্য মানুষ সমবেত হতো।

নামের সঙ্গে বর্তমান ঋতুর মিল নেই কেন?

ইসলামি বর্ষপঞ্জি সম্পূর্ণ চাঁদের আবর্তনের ওপর নির্ভরশীল। একটি হিজরি বছর প্রায় ৩৫৪ দিন, যা সৌরবর্ষের তুলনায় প্রায় ১১ দিন কম। ফলে প্রতি বছর আরবি মাসগুলো সৌরবর্ষের তুলনায় প্রায় ১১ দিন করে এগিয়ে আসে এবং ধীরে ধীরে সব ঋতুর মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়। তাই নামগুলো যে ঋতুকে কেন্দ্র করে রাখা হয়েছিল, বর্তমানে সেই ঋতুর সঙ্গে আর স্থায়ী সম্পর্ক নেই।

আরবি ১২ মাসের প্রতিটি নাম প্রাচীন আরবের আবহাওয়া, জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জীবন্ত দলিল। হিজরি বর্ষপঞ্জি ইসলামী জীবনব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ, যার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ধর্মীয় অনুশাসন জড়িত। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত আরবি মাসগুলোর নাম, অর্থ, ইতিহাস ও ধর্মীয় গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা।