আশুরার শিক্ষা ও মুহাররম মাসে একজন মুসলিমের করণীয়
আশুরার শিক্ষা ও মুহাররমে করণীয়

আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে ইবাদতের মাধ্যমে সমৃদ্ধ করার জন্য বছরজুড়ে বিভিন্ন সময় ও উপলক্ষকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। আরবি বছরের প্রথম মাস মুহাররম তেমনই একটি বরকতময় ও সম্মানিত মাস। এই মাস শুধু নতুন হিজরি বছরের সূচনাই নয়, বরং এটি আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ চারটি সম্মানিত মাসের অন্যতম। এ মাসে নফল রোজা পালন, বিশেষ করে আশুরার রোজা, একজন মুমিনের জন্য গুনাহ মাফের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই মুহাররমের প্রকৃত তাৎপর্য জানা এবং সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মুহাররম কী?

মুহাররম হলো হিজরি সনের প্রথম মাস এবং ইসলামে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ চারটি সম্মানিত মাসের একটি। আল্লাহ তাআলা বলেন— 'নিশ্চয়ই আল্লাহর বিধানে মাসের সংখ্যা বারোটি। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত।' (সুরা আত-তাওবাহ: আয়াত ৩৬) এই চারটি সম্মানিত মাস হলো— জিলকদ, জিলহজ, মুহাররম ও রজব।

মুহাররম মাসের বিশেষ ফজিলত

মুহাররমকে রাসুলুল্লাহ (সা.) 'আল্লাহর মাস' বলে অভিহিত করেছেন, যা এর মর্যাদার বিশেষ প্রমাণ। হাদিসে পাকে নবীজি (সা.) বলেছেন— 'রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।' (মুসলিম ১১৬৩) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, রমজানের পর নফল রোজার মধ্যে মুহাররমের রোজার মর্যাদা সর্বোচ্চ।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আশুরা: ইতিহাসের এক মহিমান্বিত দিন

মুহাররমের ১০ তারিখকে ইয়াওমে আশুরা বলা হয়। এই দিনে আল্লাহ তাআলা তার নবী হজরত মুসা (আ.) এবং বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে তার বাহিনীসহ সাগরে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। যখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমন করেন, তখন তিনি দেখেন ইহুদিরা এ দিনের রোজা পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে, এটি একটি মহান দিন; এদিন আল্লাহ মুসা (আ.)-কে বিজয় দান করেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

আশুরার রোজা: নববী সুন্নাহ

আশুরার রোজা রাখার ব্যাপারে নবীজি (সা.) বলেছেন— 'মুসার (আ.) ব্যাপারে আমরা তোমাদের চেয়ে অধিক হকদার।' এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে আশুরার রোজা পালন করেন এবং সাহাবিদেরও তা পালনের নির্দেশ দেন। (বুখারি ২০০৪)

আশুরার রোজার অসাধারণ ফজিলত

আশুরার দিনের রোজা গুনাহ মাফের একটি বড় মাধ্যম। হাদিসে পাকে এসেছে— 'আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা বিগত এক বছরের (সগীরা) গুনাহসমূহ মাফের কারণ হবে।' (মুসলিম ১১৬২) এটি আল্লাহর অসীম রহমতের এক অনন্য নিদর্শন।

কেন ৯ ও ১০ মুহাররম একসাথে রোজা রাখা উত্তম?

ইহুদিরাও যেহেতু ১০ মুহাররম রোজা পালন করত, তাই তাদের থেকে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে রাসুলুল্লাহ (সা.) ৯ তারিখ যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— 'আমি যদি আগামী বছর পর্যন্ত জীবিত থাকি, তবে অবশ্যই নবম তারিখেও রোজা পালন করব।' (মুসলিম ১১৩৪) তাই আলেমগণ বলেন— সর্বোত্তম: ৯ ও ১০ মুহাররম; আরও উত্তম: ৯, ১০ ও ১১ মুহাররম; ন্যূনতম: শুধু ১০ মুহাররম।

কারবালার ঘটনা ও আমাদের করণীয়

মুহাররম মাসে সংঘটিত সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি হলো কারবালার প্রান্তরে নবী (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত। নিশ্চয়ই এটি মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের একটি বেদনাদায়ক অধ্যায়। আমরা হজরত হুসাইন (রা.)-কে ভালোবাসি, তার জন্য দোয়া করি এবং তার ত্যাগ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করি। তবে শোক প্রকাশের নামে— শরীরে আঘাত করা, নিজেকে রক্তাক্ত করা, মাতম করা, তাজিয়া মিছিল বের করা, চিৎকার-চেঁচামেচি করা— এসব ইসলামে অনুমোদিত নয়। হাদিসে এসেছে— 'সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলি যুগের মতো আহাজারি করে।' (বুখারি ১২৯৪, মুসলিম ১০৩)

মুহাররম মাসে একজন মুসলিমের করণীয়

  • বেশি বেশি নফল রোজা রাখা
  • ৯ ও ১০ মুহাররম অথবা ১০ ও ১১ মুহাররম রোজা রাখা
  • তওবা ও ইস্তিগফার করা
  • কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করা
  • নফল সালাত ও দান-সদকা করা
  • আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা
  • পরিবার ও সমাজে সুন্নাহভিত্তিক আমলের প্রচার করা

মুহাররম কোনো শোকের মাস নয়; বরং এটি ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস। আশুরার রোজা আমাদেরকে নবী মুসা (আ.)-এর বিজয়ের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে। একইসঙ্গে কারবালার ঘটনা আমাদেরকে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার শিক্ষা দেয়। তাই বিদআত, কুসংস্কার ও ভিত্তিহীন আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুহাররম মাসকে কাজে লাগানোই একজন মুমিনের প্রকৃত দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মুহাররম মাসের মর্যাদা উপলব্ধি করে সুন্নাহসম্মত আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।