বর্তমান সময়ে উচ্চশিক্ষা, জীবিকানির্বাহসহ নানা প্রয়োজনে অমুসলিম দেশে গমন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রবণতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রের মতো এ বিষয়েও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
শিক্ষার উদ্দেশ্যে গমন
শিক্ষার ব্যাপারে ইসলাম সর্বদাই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কোরআনের প্রথম আয়াত নাজিল হয়েছে পড়ার আদেশ দিয়ে। অমুসলিমদের কাছ থেকে উপকারী জ্ঞান গ্রহণ করার দৃষ্টান্ত হাদিসেও বর্ণিত হয়েছে। রাসুল (সা.) বদরের যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণ হিসেবে মুসলিম সন্তানদের লেখাপড়া শেখানোর শর্ত দিয়েছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২১৬)
তাই উচ্চশিক্ষার জন্য কেউ অমুসলিম দেশে যেতে চাইলে নিম্নবর্ণিত শর্ত সাপেক্ষে তা জায়েজ:
- কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা বা জ্ঞানটি মুসলিম উম্মাহর জন্য প্রয়োজনীয়, কল্যাণকর ও উপকারী হতে হবে।
- শিক্ষা বা উচ্চতর জ্ঞানার্জনের সুব্যবস্থা যদি নিজ দেশে বা কোনো মুসলিম রাষ্ট্রে পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকে।
- সংশ্লিষ্ট অমুসলিম দেশে গিয়ে স্বাধীনভাবে ইসলামের মৌলিক বিধিবিধান (যেমন নামাজ, রোজা, হালাল খাবার ও পর্দা) মেনে চলার পূর্ণ সুযোগ থাকা।
- সেখানকার পাপের পরিবেশে নিজের ইমান, আমল ও ধর্মীয় চেতনা হারিয়ে ফেলার কোনো আশঙ্কা না থাকা। (মাহমুদ হাসান গঙ্গোহি, ফতোয়ায়ে মাহমুদিয়া, ২৫/২৮৬)
- নারী শিক্ষার্থী হলে ওপরের শর্তগুলোর পাশাপাশি মাহরাম সঙ্গে থাকাও শর্ত। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো নারী যেন মাহরাম ব্যতীত তিন দিন পরিমাণ দূরত্বের বেশি সফর না করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০৮৬)
নাগরিকত্ব গ্রহণ বা স্থায়ী বসবাস
হাদিসে নিতান্ত প্রয়োজন ব্যতীত অমুসলিমদের সঙ্গে বসবাসের ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি অমুসলমানের সঙ্গে একত্র হয় এবং তাদের সঙ্গে বসবাস করে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৮৭) তিনি আরও বলেন, ‘আমি এমন মুসলমানের ব্যাপারে দায়মুক্ত, যে অমুসলিমদের মাঝে বসবাস করে।’ (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৩৪৬১)
তবে ইসলাম সাধ্যের বাইরে কারও ওপর কোনো কিছু চাপিয়ে দেয় না (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৮৬)। সুতরাং কারও যদি অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ ও স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রয়োজন হয়, তবে প্রয়োজন ও উদ্দেশ্যের বিবেচনায় বৈধ হতে পারে। যেমন:
১. বাধ্য হয়ে গমন
যদি নিজ দেশে নির্যাতন বা অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ হওয়ার কিংবা রাষ্ট্রকর্তৃক সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আশঙ্কা থাকে এবং অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ ব্যতীত উপায় না থাকে, তাহলে দুটি শর্তে নাগরিকত্ব গ্রহণ জায়েজ হবে: (ক) নিজের ধর্ম হেফাজতের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হওয়া ও (খ) সেখানকার সব ধরনের শরিয়তবিরোধী কার্যকলাপ থেকে নিজেকে বিরত রাখা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তবে যে ব্যক্তি নিরুপায় হয়ে পড়ে, অবাধ্যতা বা সীমালঙ্ঘন না করে, তার কোনো পাপ হবে না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৭৩)
২. ধর্ম প্রচারের কাজে
যদি কোনো মুসলমান ইসলামের দাওয়াতের জন্য বা সেখানে অবস্থানরত মুসলমানদের নিকট শরিয়তের বিধিবিধান পৌঁছানোর জন্য নাগরিকত্ব গ্রহণ করে, তবে তা মোস্তাহাব। এতে সে সওয়াবও পাবে। নবীজি হজরত আলী (রা.)-কে বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম, তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হেদায়েত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০০৯)
জীবিকা ও চিকিৎসা গ্রহণ
একইভাবে যদি কোনো মুসলমানের জীবিকা নির্বাহের আবশ্যকীয় উপকরণ না থাকে এবং তার জন্য অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব ব্যতীত তা জোগাড় করা সম্ভব না হয়, তাহলে উপর্যুক্ত দুটি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে অমুসলিম দেশে যাওয়া ও অবস্থান করা জায়েজ। আল্লাহ–তাআলা অন্য সব ফরজ বিধানের মতো হালাল রুজি উপার্জন করাও ফরজ করেছেন। কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘তিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে সুগম করেছেন। অতএব, তোমরা তার জমিনে বিচরণ করো এবং তাঁর দেওয়া রিজিক আহার করো এবং তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবিত হবে।’ (সুরা মুলক, আয়াত: ১৫) সুতরাং চিকিৎসা বা এ জাতীয় অন্য কারণেও একই শর্তে বৈধ। ফকিহদের সর্বসম্মত নীতি হলো, ‘অপরিহার্য প্রয়োজনীয়তা নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে’। (ইবনে নুজাইম হানাফি, আল-আশবাত ওয়ান নাজায়ের, পৃষ্ঠা: ২৫০)
কখন বৈধ নয়
প্রথমত: কোনো অমুসলিম দেশের কৃষ্টি–কালচার, জীবনযাপন পদ্ধতি কিংবা তাদের জাতীয়তাকে ‘মুসলিম পরিচয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ’ মনে করে সেখানে যাওয়া বা স্থায়ীভাবে বসবাস করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ইসলাম সর্বদা বিজয়ী ও উচ্চ থাকে, একে অন্য কিছু দ্বারা পরাভূত করা যায় না।’ (সুনানে দারাকুতনি, ৩/২৫২) অমুসলিমদের সংস্কৃতি ও জাতীয়তাকে ইসলামের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া বৈধ নয়। তাই এই মানসিকতা নিয়ে গমন করাও বৈধ হবে না। (মুহাম্মদ তাকি উসমানি, বুহুস ফি কাজায়া ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ, ১/৩৩১)
দ্বিতীয়ত: যদি কোনো ব্যক্তির নিজ দেশে সাধারণ জীবনোপকরণ থাকে এবং সে কেবল সম্পদ বৃদ্ধি ও বিলাসিতার জন্য কোনো অমুসলিম দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে, তাহলে তা জায়েজ হবে না (মাকরুহে তাহরিমি)। (বুহুস ফি কাজায়া ফিকহিয়্যাহ মুআসিরাহ, ১/৩৩১) কারণ, এতে সে নিজে ও নিজের অনাগত প্রজন্মকে ফিতনা ও ধর্মীয় অধঃপতনের ঝুঁকিতে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের হাতকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৯৫)
বিদেশ বিষয়ক ‘কনসালটেন্সি’ করা
একই শর্তে অমুসলিম দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া, ফাইল প্রসেসিং বা কনসালটেন্সির মাধ্যমে কাউকে সহযোগিতা করা এবং এর বিনিময়ে যৌক্তিক পারিশ্রমিক বা সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করাও সম্পূর্ণ হালাল ও জায়েজ। সুতরাং যেসব ক্ষেত্রে উপর্যুক্ত শর্ত পূরণ হচ্ছে না, সেখানে সহযোগিতা করা কিংবা বিনিময় গ্রহণ করাও বৈধ হবে না। কেননা, পাপের কাজে সহযোগিতা করাও পাপ। (ইবনে আবিদিন, ফতোয়ায়ে শামি, ৯/১০৭; ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ৪/৪৭৬) আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ২)



