শয়তান মানুষকে ধাপে ধাপে যেভাবে ঘায়েল করে: ইসলামের দৃষ্টিকোণ
শয়তান মানুষকে ধাপে ধাপে যেভাবে ঘায়েল করে

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৎপথের দিশা দিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন যে শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। সে কখনো এক ধাপে মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায় না; বরং ধীরে ধীরে ইমান, আমল ও চরিত্রকে দুর্বল করে গুনাহের গভীরে ঠেলে দেয়। তাই একজন মুমিনের উচিত শয়তানের কৌশলগুলো জানা, সেগুলো থেকে সতর্ক থাকা এবং সর্বদা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন—إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا‘নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু। অতএব তোমরা তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ কর।’ (সুরা ফাতির: আয়াত ৬)

শয়তানের প্রথম কৌশল: কুফর ও শিরকের দিকে আহ্বান

শয়তানের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদ থেকে বিচ্যুত করে কুফর ও শিরকে লিপ্ত করা। কারণ শিরক এমন একটি গুনাহ, যা তাওবা ছাড়া ক্ষমা করা হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন—إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না; তবে এর নিচের গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৪৮)

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বড় গুনাহে জড়িয়ে দেওয়া

যদি কোনো মানুষ শিরক থেকে বেঁচে যায়, তখন শয়তান তাকে কবিরা গুনাহে লিপ্ত করার চেষ্টা করে। যেমন— যিনা, সুদ, হত্যা, মদপান, মিথ্যা সাক্ষ্য ইত্যাদি। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো।’ (বুখারি ২৭৬৬, মুসলিম ৮৯)

ছোট গুনাহকে তুচ্ছ মনে করানো

শয়তান মানুষকে বোঝায়—‘এটা তো ছোট গুনাহ!’ অথচ ছোট গুনাহ বারবার করতে করতে বড় গুনাহে পরিণত হয় এবং অন্তরকে কালো করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—إِيَّاكُمْ وَمُحَقَّرَاتِ الذُّنُوبِ‘তোমরা তুচ্ছ মনে করা গুনাহগুলো থেকেও সতর্ক থাকো।’ (মুসনাদ আহমাদ ৩৮০৮)

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নেক আমল থেকে দূরে রাখা

যদি কেউ গুনাহ থেকেও বেঁচে যায়, তখন শয়তান তাকে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা ও অন্যান্য নেক আমল থেকে অলসতা ও গাফিলতির মাধ্যমে দূরে সরিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—وَلَا يَصُدَّنَّكُمُ الشَّيْطَانُ‘শয়তান যেন কখনো তোমাদের (আল্লাহর পথ থেকে) বাধা না দেয়।’ (সুরা আয-যুখরুফ: আয়াত ৬২)

অন্তরে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করা

শয়তান মানুষের অন্তরে সন্দেহ, ভয়, কুমন্ত্রণা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—مِن شَرِّ الْوَسْوَاسِ الْخَنَّاسِ ٱلَّذِي يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ‘সেই কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট থেকে, যে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।’ (সুরা আন-নাস: আয়াত ৪–৫)

রাগের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা

রাগ মানুষের বিবেককে দুর্বল করে এবং অনেক গুনাহের দরজা খুলে দেয়। তাই শয়তান মানুষের মধ্যে ক্রোধ উসকে দেয়। এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বলেন—لَا تَغْضَبْ‘রাগ কর না।’ (বুখারি ৬১১৬)

ফিতনার মাধ্যমে বিভ্রান্ত করা

দুনিয়ার বিভিন্ন ফিতনার মধ্যে নারী-ফিতনা অন্যতম কঠিন পরীক্ষা। তাই ইসলাম দৃষ্টি সংযম, পর্দা ও তাকওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—مَا تَرَكْتُ بَعْدِي فِتْنَةً أَضَرَّ عَلَى الرِّجَالِ مِنَ النِّسَاءِ‘আমার পরে পুরুষদের জন্য নারীদের চেয়ে অধিক ক্ষতিকর কোনো ফিতনা রেখে যাইনি।’ (বুখারি ৫০৯৬, মুসলিম ২৭৪০)

অহংকার, হিংসা ও নাম-যশের লোভ

শয়তানের প্রথম গুনাহই ছিল অহংকার। সে মানুষকেও অহংকার, হিংসা ও রিয়ার মাধ্যমে আমল নষ্ট করার চেষ্টা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ‘যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (মুসলিম ৯১)

হারামকে আকর্ষণীয় করে তোলা

শয়তান হারাম কাজকে সুন্দর ও আনন্দদায়ক বলে উপস্থাপন করে, যাতে মানুষ সহজেই তাতে জড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন—وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ‘শয়তান তাদের কাছে তাদের কাজগুলোকে শোভনীয় করে দেখিয়েছে।’ (সুরা আন-নাহল: আয়াত ৬৩)

ঝগড়া-বিবাদ ও বিভেদ সৃষ্টি করা

শয়তান মানুষের মধ্যে শত্রুতা, হিংসা, ঝগড়া ও সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে চায়। আল্লাহ তাআলা বলেন—إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ‘শয়তান তো চায় তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে।’ (সুরা আল-মায়িদাহ: আয়াত ৯১)

শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অস্ত্রের নয়; এটি ইমান, তাকওয়া, ইলম, ইখলাস ও ধৈর্যের যুদ্ধ। যে ব্যক্তি কুরআনকে আঁকড়ে ধরে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, নিয়মিত জিকির-আজকার করে, আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করে, আল্লাহ তাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—إِنَّ كَيْدَ الشَّيْطَانِ كَانَ ضَعِيفًا‘নিশ্চয়ই শয়তানের কৌশল অত্যন্ত দুর্বল।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৭৬)