হিজরি সনের সূচনা: ইতিহাস ও তাৎপর্য
হিজরি সনের সূচনা: ইতিহাস ও তাৎপর্য

হিজরি সন (চান্দ্র বছর) বা ক্যালেন্ডারের সূচনা ও শুরুর ইতিহাস সংক্ষেপে এমন যে, ‘মুহাররমুল হারাম’ এই ক্যালেন্ডারের প্রথম মাস এবং এই মাস থেকেই হিজরি বছরের সূচনা হয়। রাসুল (সা.)-এর সমাজসংস্কার ও প্রশিক্ষণদানের পদ্ধতি অনেকটা এরকম ছিল, আরবে তাঁর নবুয়তপ্রাপ্তির আগে থেকে প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতি, প্রথা ও বিশ্বাসগুলোর মধ্যে যেসব বিষয় ইসলামের মৌলিক শিক্ষা তাওহিদের পরিপন্থি এবং শিরকভিত্তিক ছিল, সেগুলোর তিনি কঠোর বিরোধিতা করতেন ও তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন। পাশাপাশি সেগুলোকে মূলোৎপাটন করে দূর করে দিয়েছিলেন। আর কিছু বিষয়, রীতি-নীতি ও বিশ্বাস এমন ছিল; যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামের তাওহিদি শিক্ষার পরিপন্থি ছিল, কিন্তু সংশোধনযোগ্য ছিল। তিনি সেগুলোর সংশোধন করে সামাজিকভাবে প্রচলিত ও কার্যকর রেখেছিলেন। আর যেসব বিষয় বা রীতি-নীতি মানবজাতির জন্য উপকারী ছিল এবং ইসলামের শিক্ষারও পরিপন্থি ছিল না, সেগুলোকে তিনি অবিকল বহাল রেখেছিলেন। পাশাপাশি তিনি আরও বহু নতুন বিষয়ের প্রচলন করেছিলেন, যা তৎকালীন পরিস্থিতি ও সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয়ও ছিল।

হিজরি সনের সূচনা

এমন প্রেক্ষাপট সামনে রেখে যদি হিজরি সনকে দেখি, তাহলে বলা যায়, এই বর্ষপঞ্জির সূচনা এভাবে হয়েছিল যে, রাসুল (সা.) যখন মাক্কি জীবনের কঠিন কঠিন পরীক্ষা অতিক্রম করে মদিনা মুনাওয়ারার উদ্দেশে হিজরতের লক্ষ্যে রওনা হন, তখন পথে কুবা নামক স্থানে অবস্থান করেন। হিজরি সনের সূচনা সেই দিন থেকেই ধরা হয়। আসলে ইসলামের আগে আরবদের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট সন বা তারিখের প্রচলন ছিল না। কোনো বিশেষ ঘটনাকে একটি তারিখ হিসেবে ধরে অন্য কোনো ঘটনার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হতো। যেমন; ‘আমুল ফীল’ (হাতির বছর)। কিন্তু এগুলো প্রকৃত ও স্থায়ী তারিখ বা সন ছিল না। ফলে এভাবে ঘটনাবলির সঠিক তারিখ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব ছিল না। এই সমস্যার সমাধানের দিকে খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে দৃষ্টি দেওয়া হয় এবং সেই পরিস্থিতিতে হিজরি সন ইসলামি বর্ষ হিসেবে ইসলামি ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়; যা ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ওমর (রা.)-এর খেলাফতে হিজরি সনের প্রয়োজনীয়তা

হজরত ওমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় ইসলাম শাসনব্যবস্থা বিশ্বের বিরাট একটি অংশে পৌঁছে গিয়েছিল। পৃথিবীর তিন ভাগের ওপর হজরত ওমর (রা.)-এর ইসলামি শাসনের পতাকা উড়ছিল। তখন হজরত ওমর (রা.) ইসলামি সাম্রাজ্যের রাজধানী মদিনা মুনাওয়ারায় বসে তার শাসিত বিস্তৃত অঞ্চলের পরিস্থিতির খোঁজখবর এবং রাষ্ট্র পরিচালনার তথ্য চিঠিপত্রের মাধ্যমে গ্রহণ করতেন। একবার তিনি তার গভর্নর হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-কে একটি চিঠি লিখলেন। চিঠির উত্তরে আবু মুসা লিখলেন, ‘হে আমিরুল মুমিনিন! আপনার যেসব চিঠি ও ফরমান আমাদের কাছে পৌঁছেছে, সেগুলোর মধ্যে কোনো তারিখ লেখা থাকে না।’ তখন হজরত ওমর (রা.)-এর গভীর উপলব্ধি হলো, ইসলাম একটি বিশ্বজনীন, পূর্ণাঙ্গ এবং মানবজীবনের প্রতিটি দিক ও বিভাগের অন্তর্ভুক্তকারী ধর্ম। এর নিজস্ব একটি স্বতন্ত্র ইতিহাস ও সন থাকা অত্যন্ত জরুরি। তাই তিনি মদিনায় তার ‘মজলিসে শূরা’র (পরামর্শ পরিষদ) একটি বৈঠক আহ্বান করলেন, যা বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম (রা.) দ্বারা গঠিত ছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মজলিসে শূরায় আলোচনা

বৈঠকে ইসলামকে একটি বিশ্বজনীন ধর্ম এবং মুসলমানদের একটি আন্তর্জাতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করে হজরত ওমর (রা.) ইসলামি ইতিহাস ও সনের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি ব্যাপক ভাষণ প্রদান করলেন। এরপর মজলিসে শূরায় আলোচনা হলো, তাহলে চাঁদের হিসাব অনুযায়ী বর্ষ গণনা শুরু হোক। কারণ, চাঁদের পরিবর্তনশীল অবস্থার মাধ্যমে তারিখ চেনা সহজ হয়। পক্ষান্তরে সূর্যের বিষয়টি এমন, সূর্য প্রতিদিন প্রায় একই অবস্থায় উদিত হয়। এ ছাড়াও রাসুলও (সা.) চাঁদের হিসাবকে পছন্দ করতেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর (রা.) বললেন, তাহলে ইসলামি বছর চাঁদের হিসাব অনুযায়ীই হবে। তখন মজলিসে শূরায় দ্বিতীয় প্রশ্ন উঠলো, ইসলামি সন বা তারিখের সূচনা কখন থেকে করা হবে?

সূচনা বিন্দু নির্ধারণ

কিছু সাহাবায়ে কেরাম (রা.) পরামর্শ দিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম থেকে শুরু করা হোক। এ বিষয়ে হজরত ওমর (রা.) বললেন, এতে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সাদৃশ্য হয়ে যায়, কারণ তাদের সনের সূচনা হজরত ঈসা (আ.)-এর জন্ম থেকে হয়। কেউ কেউ প্রস্তাব দিলেন, যেদিন রাসুলুল্লাহকে (সা.) নবুওয়ত দেওয়া হয়েছে, সেদিন থেকে ইসলামি সনের সূচনা হোক। এই প্রস্তাবও হজরত ওমর ফারুক (রা.) প্রত্যাখ্যান করলেন এবং যুক্তি দিলেন, নবুওয়তের প্রাথমিক সময় ছিল মুসলমান, ইসলাম ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর নির্যাতন ও অবিচারের যুগ। এরপর সাহাবায়ে কেরামের একটি অংশ প্রস্তাব দিলেন, রাসুল (সা.)-এর ওফাতের তারিখ থেকে ইসলামি পঞ্জিকার সূচনা করা যেতে পারে। হজরত ওমর (রা.) এটিও প্রত্যাখ্যান করলেন এবং বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের দিন মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের জন্য অনেক বড় বিপদ ও মহান ক্ষতির চেয়ে কম নয়। তাই এই দিনটিও উপযুক্ত নয়।

হজরত আলী (রা.)-এর প্রস্তাব

হজরত আলী (রা.) প্রস্তাব দিলেন, ইসলামি বছর, সন ও তারিখের সূচনা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনার দিকে হিজরতের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা থেকে শুরু করা হোক। নবীজি (সা.)-এর হিজরত মানব ইতিহাসের সেই মহান ঘটনা; যার মাধ্যমে কুফর ও ইসলাম এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্য ও বিভাজন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে জুমা ও দুই ঈদের নামাজের মতো ইসলামের নিদর্শনগুলোও হিজরতের পর থেকে প্রকাশ্যে আদায় করা হয়েছে। আর ইসলামের বিজয়ের সূচনাও হয়েছে নবীজি (সা.)-এর হিজরত থেকেই। হজরত আলী (রা.)-এর এমন প্রস্তাবে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হলো।

মাস নির্ধারণ

এরপর প্রশ্ন উঠলো, ইসলামি বর্ষপঞ্জির সূচনা কোন মাস থেকে হবে। কেউ কেউ রমজান মাসের প্রস্তাব দিলেন। হজরত আলী (রা.) বললেন, যে মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করেছেন, সেই মাস থেকেই ইসলামি বছর শুরু হওয়া উচিত। রাসুল (সা.) হিজরত করেছেন রবিউল আউয়াল মাসে, কিন্তু তিনি হিজরতের ইচ্ছা ও সংকল্প মুহাররমুল হারাম মাসেই করেছিলেন। তাই ইসলামি পঞ্জিকা ও ইতিহাসের সূচনা মুহাররমুল হারাম থেকে হওয়া উচিত। হজরত ওমর (রা.) বললেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মুহাররমকে ‘শাহরুল্লাহিল মুহাররম’ অর্থাৎ ‘মুহাররম আল্লাহর মাস’ বলেছেন। আর এই মাসে সাধারণত হাজিরাও হজ থেকে অবসর গ্রহণ করে নিজ নিজ দেশ ও বাড়িতে ফিরে যান।

ইসলামি ক্যালেন্ডার চালু

এভাবে হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকালে তার মজলিসে শূরায় ‘তারা নিজেদের পারস্পরিক বিষয়গুলো পরামর্শের মাধ্যমে সম্পন্ন করে’ এই কোরআনি নির্দেশের অধীনে বৃহস্পতিবার ৩০ জমাদিউস সানি ১৭ হিজরি (নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিজরতের ১৭ বছর পর), মোতাবেক জুলাই ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে, ১ মুহাররম থেকে ইসলামি ক্যালেন্ডার চালুর ফারমান জারি করা হয়। যার কার্যকারিতা অতীতে সেই দিন থেকে ধরা হয়, যেদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদিনা মুনাওয়ারায় আগমন করেছিলেন, অর্থাৎ জুলাই ৬২২ খ্রিস্টাব্দ।

হিজরি বর্ষপঞ্জি পৃথিবীতে প্রচলিত ক্যালেন্ডারগুলোর মধ্যে একটি অত্যন্ত পরিচিত ও প্রসিদ্ধ পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার। এর সূচনাবিন্দু হলো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর গুরুত্বপূর্ণ সফর, হিজরত; যা আল্লাহর নির্দেশ পালনের পাশাপাশি তার (সা.) জীবনী বা সিরাতের এক উজ্জ্বল অধ্যায় এবং মানব ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য ও অনন্য স্মরণীয় মুহূর্ত।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও মাদ্রাসাশিক্ষক