মানুষের জীবনে প্রতিযোগিতা নতুন কোনো বিষয় নয়। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ অন্যের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। কেউ সম্পদে, কেউ ক্ষমতায়, কেউ জ্ঞানে, আবার কেউ সামাজিক মর্যাদায় নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে চেয়েছে। এই প্রবণতা মানুষের স্বভাবের অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই সৃষ্টি হয়, যখন প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে দুনিয়া, আর জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যায়।
প্রযুক্তির যুগে প্রতিযোগিতার রূপান্তর
প্রযুক্তির এই যুগে প্রতিযোগিতার রূপ পাল্টেছে। একসময় মানুষ নিজের বাড়ি, গাড়ি কিংবা পোশাক নিয়ে গর্ব করত। আজ মানুষ গর্ব করে তার ফলোয়ার সংখ্যা, লাইক, কমেন্ট, শেয়ার ও অনলাইন জনপ্রিয়তা নিয়ে। সমাজের চোখে সফলতার সংজ্ঞাও যেন বদলে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে একজন মানুষ কতটা জ্ঞানী, কতটা সৎ বা কতটা উপকারী—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সে কতটা পরিচিত এবং কতজন মানুষ তাকে অনুসরণ করছে।
কোরআনের সতর্কবার্তা
এই প্রবণতা সম্পর্কে আল্লাহ–তাআলা আমাদের বহু আগেই সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে ভুলিয়ে রেখেছে। যতক্ষণ না তোমরা কবরের সাক্ষাৎ করবে।’ (সুরা তাকাসুর, আয়াত: ১-২) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় মুফাসসিরগণ বলেছেন, মানুষ যখন দুনিয়ার প্রাচুর্য, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিযোগিতায় মগ্ন হয়ে যায়, তখন সে নিজের প্রকৃত গন্তব্যকে ভুলে বসে। কবরের মুখোমুখি হওয়ার আগপর্যন্ত সে দৌড়াতেই থাকে।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্কৃতি এই আয়াতকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ দেয়। কারণ, এখানে প্রতিযোগিতার নতুন মাপকাঠি তৈরি হয়েছে। কার ছবি বেশি সুন্দর? কার ভ্রমণ বেশি আকর্ষণীয়? কার জীবন বেশি বিলাসবহুল? এসব প্রশ্নই যেন আমাদের সময়ের নতুন প্রতিযোগিতা।
অবিশ্বাসীদের বিলাসিতা ও মুমিনের পরীক্ষা
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, “দেশে দেশে অবিশ্বাসীদের (মুক্ত ও বিলাসবহুল) চলাফেরা যেন তোমাকে কোনো অবস্থাতেই বিভ্রান্ত না করে।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯৬) আয়াতে তাকাল্লুব শব্দ এসেছে, যার মূল অর্থ হলো এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তন হওয়া, ওলট-পালট হওয়া বা ঘোরাফেরা করা। আয়াতে এর দ্বারা অবিশ্বাসীদের ব্যবসায়িক সফর, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, ক্ষমতা, বিলাসিতা এবং দেশ-বিদেশে তাদের অবাধ ও সফল বিচরণকে বোঝানো হয়েছে।
মক্কার অবিশ্বাসী কাফের ও মদিনার ইহুদিরা তৎকালীন সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ সফল ছিল। তারা দামি পোশাক, উন্নত খাবার এবং বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। অন্যদিকে ইমানি আনার কারণে মুসলমানরা চরম অর্থনৈতিক সংকট, দারিদ্র্য এবং কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারত—যারা আল্লাহর অবাধ্য, তারা এত সুখে ও স্বাধীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেন, আর আল্লাহর অনুগত বান্দারা কেন এত কষ্টে? এই মানসিক দ্বন্দ্ব ও সংশয় দূর করতেই আল্লাহ–তাআলা এই আয়াত নাজিল করেন।
এই আয়াতের পরবর্তী আয়াতেই (আয়াত ১৯৭) আল্লাহ বলেন, “এ তো হলো সামান্য ভোগ মাত্র, তারপর তাদের আবাসন হলো জাহান্নাম, আর ওটা কতই না নিকৃষ্ট বাসস্থান!” এই আয়াতের আলোকে মুফাসসিররা বলেছেন, দুনিয়াতে কারো ধন-সম্পদ, ক্ষমতা বা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থাকার অর্থ এই নয় যে আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট। কাফের ও জালিমদের এই জাঁকজমকপূর্ণ চলাফেরা কেবলই সাময়িক পরীক্ষা বা ‘ইস্তিদরাজ’ (আল্লাহ কর্তৃক ঢিল দেওয়া)। আল্লাহ তাদের অবকাশ দেন যেন তারা তাদের পাপের সীমা পূর্ণ করতে পারে।
প্রকৃত মর্যাদার মাপকাঠি: তাকওয়া
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, মানুষের মর্যাদার প্রকৃত মাপকাঠি সম্পদ, সৌন্দর্য কিংবা জনপ্রিয়তা নয়; বরং তাকওয়া। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সে-ই অধিক সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াবান।’ (সুরা হুজুরাত, আয়াত : ১৩) কিন্তু আধুনিক সংস্কৃতি আমাদেরকে ঠিক উল্টো বার্তা দিচ্ছে। সেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারিত হয় তার দৃশ্যমান অর্জনের ভিত্তিতে। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে অন্তরের পরিশুদ্ধতার চেয়ে বাহ্যিক প্রদর্শনকে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে।
রিয়া: লোক দেখানো আমলের বিপদ
এমনকি অনেক সময় আমরা একটি ঘটনার ভেতরে উপস্থিত থেকেও প্রকৃতপক্ষে সেখানে উপস্থিত থাকি না। কারণ, আমাদের মন পড়ে থাকে—কীভাবে ভালো একটি ছবি তোলা যায়, কীভাবে ভিডিওটি সম্পাদনা করা যায়, কিংবা কী ক্যাপশন দিলে বেশি মানুষের মনোযোগ পাওয়া যাবে। এভাবেই আনন্দের মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে প্রদর্শনের উপকরণে পরিণত হয়।
যখন মানুষের সাহায্য করার চেয়ে প্রশংসা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যখন আল্লাহর সন্তুষ্টির চেয়ে মানুষের প্রশংসা বড় হয়ে যায়। যখন সেবার চেয়ে প্রদর্শন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলামে এই রোগের নাম রিয়া—লোক দেখানো আমল। রিয়া এমন একটি বিপজ্জনক ব্যাধি, যা অজান্তেই মানুষের আমলকে নষ্ট করে দিতে পারে। বাহ্যিকভাবে কাজটি ভালো হলেও যদি তার উদ্দেশ্য হয় মানুষের প্রশংসা অর্জন, তাহলে সেই কাজের আধ্যাত্মিক মূল্য কমে যায়।
প্রশ্ন: আমি কিসের পেছনে ছুটছি?
পার্থিব প্রতিযোগিতার এই যুগে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো নিজেকে জিজ্ঞেস করা—আমি কিসের পেছনে ছুটছি? মানুষের প্রশংসা, নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টি? আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা একটি ছোট আমলও চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।



