কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার সম্পদ শর্তাবলি
কুরবানি ইসলামি শরিয়তের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরতের পর প্রতি বছর পালন করেছেন এবং কখনও পরিত্যাগ করেননি। তিনি কুরবানি পরিত্যাগকারীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন, যা এই ইবাদতের মর্যাদা ও বাধ্যতামূলকতা নির্দেশ করে।
কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার মৌলিক শর্ত
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলমান নর-নারী মুকিম ব্যক্তির উপর কুরবানি ওয়াজিব হবে, যদি তারা ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়।
নেসাবের পরিমাণ:
- স্বর্ণের ক্ষেত্রে: সাড়ে সাত ভরি।
- রুপার ক্ষেত্রে: সাড়ে বায়ান্ন ভরি।
- অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে: সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের সম্পদ।
যদি স্বর্ণ বা রুপা পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না হয়, তবে উভয়টি মিলে বা প্রয়োজন-অতিরিক্ত অন্য বস্তুর মূল্য যোগ করে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্য অর্জিত হলে, কুরবানি ওয়াজিব হবে।
কোন সম্পদ গণনা করা হবে?
কুরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত সম্পদগুলি হিসাবযোগ্য:
- স্বর্ণ-রুপার অলঙ্কার।
- নগদ অর্থ।
- যে জমি বার্ষিক খোরাকির জন্য প্রয়োজন হয় না।
- প্রয়োজন অতিরিক্ত আসবাবপত্র, পোশাক-পরিচ্ছেদ, তৈজসপত্র।
- প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র।
উল্লেখ্য: এই সম্পদের উপর এক বছর অতিক্রম হওয়া শর্ত নয়; কুরবানির দিনগুলিতে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই তা ওয়াজিব হবে।
জাকাত ও কুরবানির পার্থক্য
অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, জাকাত ফরজ হওয়ার জন্য যে ধরনের সম্পদ প্রয়োজন, যেমন টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, ব্যবসায়িক সম্পদ, কুরবানির জন্যও একই শর্ত প্রযোজ্য। কিন্তু এটি সঠিক নয়। সঠিক মাসআলা হল, যে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির কাছে কুরবানির দিনগুলোতে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্য পরিমাণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোন ধরনের সম্পদ থাকবে, তার উপরই কুরবানি ওয়াজিব। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, সৌখিন বা অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, তা ব্যবহৃত হোক বা না হোক, এসব কিছুও কুরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে গণনা করা হয়। তবে জাকাতের বেলায় এগুলো ধর্তব্য হয় না। তাই টাকা-পয়সা, সোনা-চাঁদি ও ব্যবসায়িক সম্পদ না থাকলেও প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধনসম্পদ, আসবাবপত্রের মূল্য নেসাব পরিমাণ হলেই কুরবানি ওয়াজিব হবে।
কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার সময়সীমা
একটি সাধারণ ভুল ধারণা হল যে, শুধু যিলহজ্বের ১০ তারিখে কুরবানির নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে কুরবানি ওয়াজিব হবে না। কিন্তু মাসআলা হল, যিলহজ্বের ১০ তারিখ সুবহে সাদিক থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত মোট তিন দিন কুরবানি করা যায়। এ তিন দিনের মধ্যে যেকোন সময় কেউ নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে, তাকেই কুরবানি দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো অবিবাহিত মেয়ের উপর কুরবানি ওয়াজিব না হয়, কিন্তু যিলহজ্বের ১১ তারিখে তার বিয়ে হয়ে স্বামী তাকে স্বর্ণ, টাকা-পয়সা ইত্যাদি দেয়, যা সাড়ে ৫২ তোলা রুপার সমপরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি, তবে সে এই দিনেও কুরবানি করতে বাধ্য হবে।
সুতরাং, কুরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদের নেসাব পরিমাণ এবং সময়সীমা সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য, যাতে এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সঠিকভাবে পালন করা যায়।



