মহানবী (সা.)-এর অধীনদের প্রতি ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ: সম্মান ও দয়ার নীতির শিক্ষা
মহানবী (সা.) মানুষের মর্যাদা, অবস্থান ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও উত্তম আচরণ করতেন। তাঁর চরিত্রে সম্মান, দয়া, ন্যায়বিচার ও বিনয়ের গুণাবলি ছিল ভূষণস্বরূপ। তিনি সমাজের প্রবীণ, জ্ঞানী ও মর্যাদাবান ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান দিতেন, পাশাপাশি অধীনস্থ শ্রমিক ও কর্মচারীদের সঙ্গেও দয়া, সহানুভূতি ও ন্যায়পরায়ণতার আচরণ করতেন।
অধীনদের প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা
মহানবী (সা.) কখনো অধীনদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন না; বরং সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে তাদের সঙ্গে আচরণ করতেন। তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী, অধীনদের সঙ্গে উত্তম ব্যবহার ইমানেরই অংশ। তিনি নিজেই ছিলেন এ শিক্ষার বাস্তব দৃষ্টান্ত। নিজের কাজ তিনি নিজেই করতেন এবং অধীনস্থদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতেন না। তিনি কখনো কোনো খাদেম বা কর্মচারীকে গালমন্দ করেননি বা মারধর করেননি।
রাসুল (সা.)-এর দীর্ঘদিনের সেবক আনাস (রা.) বলেন, ‘আমি ১০ বছর নবীজির খেদমত করেছি; কিন্তু তিনি কখনো আমার প্রতি উফ শব্দটি করেননি। এ কথা জিজ্ঞেস করেননি, তুমি এ কাজ কেন করলে এবং কেন করলে না?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০৩৮)। এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়, মহানবী (সা.) কতটা ধৈর্য ও কোমলতার সঙ্গে অধীনদের সঙ্গে আচরণ করতেন।
কেয়ামতে জিজ্ঞাসাবাদের সতর্কতা
বস্তুত অধীনদের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে প্রত্যেক মানুষকেই জিজ্ঞাসিত হতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল বা রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তাঁর অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। শাসক তাঁর লোকজনের রাখাল স্বরূপ, তাঁকে তাঁর শাসিতদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। গৃহকর্তা তাঁর গৃহবাসীর রাখালস্বরূপ, তাঁকে তাঁর গৃহবাসীদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হবে। দাস তাঁর মনিবের সম্পদের রাখালস্বরূপ, তাঁকে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। মনে রাখবে, তোমাদের প্রত্যেকেই (কোনো-না-কোনোভাবে) রাখালস্বরূপ এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তাঁর অধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৫৫৮)।
এই হাদিসটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, অধীনদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
অধীনদের ভাই হিসেবে গণ্য করা
রাসুল (সা.) অধীনদের নিজেদের ভাই হিসেবে উল্লেখ করে তাদের অধিকারের ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের ওপর অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপিয়ে দিতেও নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, ‘যে চায় তাঁকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করা হোক এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হোক, তার মৃত্যু যেন এমন অবস্থায় আসে যে, সে আল্লাহ এবং শেষ দিবসের প্রতি ইমান রাখে। আর মানুষের সঙ্গে তেমন আচরণ করে, যেমন আচরণ পেতে সে পছন্দ করে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮৪৪)।
অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, জায়েদ (রা.) সারা জীবন নবীজির কাছে এমনভাবে ছিলেন, মনে হতো যেন তিনি তাঁর ছেলে। জায়েদ নবীজির ছেলের মতো আদরযত্নে বড় হয়েছেন এবং প্রাণঢালা স্নেহ পেয়েছেন। বড় হলে নবীজি (সা.) জায়েদকে আপন চাচাতো বোন জাইনাবের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে পরিবারের একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় করে নেন। অথচ জায়েদ ক্রীতদাস হিসেবে এসেছিলেন নবীজির সংসারে। জায়েদের ছেলে ওসামাকেও তিনি খুব আদর করতেন, মনে হতো নাতি হাসান ও হুসাইনের মতোই আপন।
সহযোগিতা ও সদাচরণের নির্দেশনা
নবীজি অধীনস্থ শ্রমিক-কর্মচারীদের আপনজনের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের আপনজন ও আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করো, তাদের সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করবে।’ আরেক হাদিসে উল্লেখ করেছেন এভাবে, ‘তারা (শ্রমিক, অধীনস্থ বা ক্রীতদাস) হচ্ছে তোমাদের ভাই, সুতরাং তাদের সঙ্গে সদয় ব্যবহার কর। তোমাদের একার পক্ষে যে কাজ করা অসম্ভব, তাতে তাদের সাহায্য গ্রহণ কর; আবার তাদের একার পক্ষে যে কাজ করা অসম্ভব, তাতে তোমরাও তাদেরকে সাহায্য করো।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৯০)।
তিনি এমনও বলেছেন, ‘কর্মচারীকে তার কাজে সাহায্য করবে। কেননা, আল্লাহর কর্মচারী ব্যর্থ হয় না।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১৯১)।
মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্কের গুরুত্ব
মালিক-শ্রমিকের সুসম্পর্ক স্থাপনের জন্য এবং সদাচরণের নিমিত্তে তিনি আহারের সময় অধীনস্থ খাদেমকেও সঙ্গে নিয়ে বসার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘যখন তোমাদের মধ্যকার কারও খাদেম তার আহার্য নিয়ে আসে, তখন তাকেও সঙ্গে বসিয়ে নেওয়া উচিত। সে যদি তাতে সম্মত না হয়, তবে তাকে তা হতে কিছু দিয়ে দেওয়া উচিত।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ২০০)।
বলেছেন, ‘তোমাদের খাদেম যদি তোমাদের খাদ্য প্রস্তুত করে এবং তা নিয়ে যদি তোমাদের কাছে আসে, যা রান্না করার সময় আগুনের তাপ দেয় ও ধোঁয়া তাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে, তখন তাকে খাওয়াবে। খাবারদাবার অল্প হলেও তার হাতেও এক-দুমুঠো তুলে দেবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৬৭)।
মালিকদের নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন কর্মচারী, শ্রমিক ও অধীনদের সঙ্গে সন্তানের ন্যায় আচরণ করে এবং তাদের ইজ্জত-সম্মানের কথা স্মরণ রাখে।
কঠোরতার বিরুদ্ধে সতর্কতা
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি আল্লাহর রাসুলকে বলতে শুনেছি, “হে আল্লাহ, যে ব্যক্তি আমার উম্মতের যে কোনো পর্যায়ের কর্তৃত্ব লাভ করে তাদের সঙ্গে কোমল হয়, আপনিও তার প্রতি কোমল হোন। আর যে ব্যক্তি আমার উম্মতের কর্তৃত্ব পেয়ে তাদের সঙ্গে কঠোর হয়, আপনিও তার সঙ্গে কঠোর হোন।”’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৮২৮)।
নবীজি একবার খাদেম সাহাবি আনাসকে কোনো এক কাজে পাঠিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি পথিমধ্যে বালকদের সঙ্গে খেলায় লিপ্ত হয়ে যান। দেখতে পেয়ে নবীজি পেছন থেকে এসে তাঁর ঘাড়ে হাত রাখেন। আনাস পেছনে তাকিয়ে দেখেন, নবীজি হাসছেন। (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৩)।
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর রাসুল কখনো কোনো সেবক বা নারীকে মারধর করেননি।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৮৬)। কাজের মানুষ তো স্বাধীন। একজন কৃতদাসকেও যদি প্রহার করা হয়, তার শাস্তিও ভয়াবহ। নবীজি বলেছেন, ‘যদি কেউ তার দাস-দাসীকে অন্যায়ভাবে প্রহার করে, কেয়ামতের দিন তাকেও এভাবে প্রহার করে তার থেকে বদলা নেওয়া হবে।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১৮১)।
মহানবী (সা.)-এর এই শিক্ষাগুলো আজও আমাদের জন্য পথনির্দেশক, যা সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে।



