শ্রবণ শক্তি ও ইসলাম: হৃদয়ে হেদায়েত পৌঁছানোর মূল চাবিকাঠি
শ্রবণ শক্তি ও ইসলাম: হৃদয়ে হেদায়েতের চাবিকাঠি

শ্রবণ শক্তি: হৃদয়ে হেদায়েত পৌঁছানোর মূল প্রবেশপথ

মানুষের হৃদয়ে হেদায়েত পৌঁছানোর প্রধান প্রবেশপথ হলো কান। অথচ বর্তমান সময়ে আমাদের অধিকাংশ সমস্যার মূলে রয়েছে 'শুনেও না শোনার' প্রবণতা। আমরা কথা বলতে যতটা আগ্রহী, অন্যের কথা শুনতে ততটাই বিমুখ। ফলে আমাদের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত ভুল বোঝাবুঝি, কলহ ও বিতণ্ডার মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে।

কোরআনের সতর্কবাণী: শ্রবণেন্দ্রিয়ের সঠিক ব্যবহার

আল্লাহ তাআলা কোরআনে সেইসব মানুষের নিন্দা করেছেন যারা তাদের শ্রবণেন্দ্রিয়কে কার্যকর রাখে না। সুরা আনফালের ২০-২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করো এবং শোনার পর তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা বলে ‘আমরা শুনেছি’, অথচ তারা শোনে না।” এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেয় যে, শুধু শোনাই নয়, তা গ্রহণ করা ও অনুসরণ করাও অপরিহার্য।

পারিবারিক জীবনে শ্রবণের অভাব

অনেক বাবা-মা অভিযোগ করেন যে, তাদের সন্তানরা তাঁদের কথা শোনে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তাঁরা নিজেরা কি সন্তানদের কথা মন দিয়ে শোনেন? বড়রা অনেক সময় ছোটদের জ্ঞানতৃষ্ণা বা মনের কথাকে অবজ্ঞা করে থামিয়ে দেন। অথচ শোনার এই গুণটি স্বয়ং আল্লাহর। তিনি ইবলিসের মতো অভিশপ্ত সত্তার যুক্তিহীন দাবিগুলোও মন দিয়ে শুনেছিলেন, যার বর্ণনা কোরআনের সাতটি জায়গায় এসেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

মহানবীর (সা.) শ্রবণ-উদারতা: একটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত

মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বকালের সেরা শ্রোতা। তিনি মুমিন-কাফের, নারী-পুরুষ, স্বাধীন-দাস—সবার কথাই ধৈর্য ধরে শুনতেন। মক্কায় যখন কাফের নেতা উতবা ইবনে রাবিয়া নবীজিকে আপসের প্রস্তাব দিতে এলেন, তখন নবীজি তাকে থামিয়ে দেননি। উতবা যখন দুনিয়াবি লোভ-লালসা, সম্পদ ও নেতৃত্বের প্রস্তাব দিচ্ছিলেন, নবীজি নির্বিকারভাবে তা শুনলেন। তার কথা শেষ হলে নবীজি বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “আবুল ওয়ালিদ, আপনার কথা কি শেষ হয়েছে?” তিনি বললেন, “হ্যাঁ।” এরপর নবীজি কোরআনের আয়াত পড়ে তাকে উত্তর দিলেন।

এক ব্যক্তি পাওনা আদায়ের দাবিতে নবীজির সঙ্গে রূঢ় আচরণ করল। সাহাবিরা তাকে শাসন করতে চাইলে নবীজি বললেন, “ওকে ছেড়ে দাও, পাওনাদারের কথা বলার অধিকার আছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২২৬০)। বাজারের সাধারণ নারী থেকে শুরু করে মরুর অভব্য বেদুঈন—সবার অভিযোগ বা সমস্যার কথা তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। এমনকি মোনাফেকরা তাঁর এই শ্রবণ-উদারতা দেখে বিদ্রূপ করে বলত, “তিনি তো (সবার কথায়) কান দেন।” আল্লাহ এর জবাবে বললেন, “বলুন, তাঁর এই কান দেওয়া তোমাদের জন্যই কল্যাণকর।” (সুরা তওবা, আয়াত: ৬১)।

বর্তমান সময়ে শ্রবণ-বিমুখতার সংকট

বর্তমান সময়ে যারা নেতৃত্বে আছেন, তাঁদের বড় অভাব হলো সাধারণ মানুষের কথা শোনার ধৈর্য। অনেক সময় অভিযোগ বা অভাব-অভিযোগের শুনানি 'মিটিং' বা 'ব্যস্ততার' অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া হয়। অথচ নবীজির দরবারে একজন বয়স্ক নারী বা নির্যাতিত মানুষও দীর্ঘক্ষণ তাঁর কথা বলতে পারতেন। কোরআনের সুরা মুজাদালাহ-এর সূচনাই হয়েছে এক নারীর অভিযোগ শোনাকে কেন্দ্র করে, যার আর্জি স্বয়ং আল্লাহ আসমান থেকে শুনেছেন।

ইসলামে 'অ্যাক্টিভ লিসেনিং' বা সুশোভন শ্রবণের শিক্ষা

কোরআন–সুন্নাহ আমাদের তিনটি বিশেষ ক্ষেত্রে সুশোভন শ্রবণের (অ্যাক্টিভ লিসেনিং) শিক্ষা দেয়:

  1. কোরআন পাঠের সময়: “যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা মনোযোগ দিয়ে তা শোনো এবং চুপ থাকো, যাতে তোমাদের ওপর রহমত বর্ষিত হয়।” (সুরা আরাফ, ২০৪)।
  2. জুমার খুতবা: জুমার দিন ইমামের খুতবা মন দিয়ে শোনা ওয়াজিব। হাদিসে এসেছে, খুতবা চলাকালে যদি কেউ পাশে বসা কাউকে 'চুপ করো' বলে, তবে সেও অনর্থক কাজ করল এবং তার জুমার সওয়াব নষ্ট হলো।
  3. জ্ঞানার্জনের মজলিস: বড়দের বা ছোটদের—যেকোনো আলোচনা শোনার সময় পূর্ণ মনোযোগী হওয়া জরুরি। তাবেয়ি আতা (রহ.) বলতেন, “কোনো যুবক যখন আমাকে কোনো কথা বলে, এমনভাবে তা শুনি যেন আগে কখনো শুনিনি; হতে পারে সেই তরুণের জন্মের আগেই তা শুনেছি।”

সঠিক জ্ঞান ও হেদায়েত পাওয়ার প্রথম শর্তই হলো সুন্দরভাবে শোনা। যারা কথা শুনে তার মধ্য থেকে সর্বোত্তমটি গ্রহণ করে, আল্লাহ তাদেরই 'বিচক্ষণ' (উলুল আলবাব) বলে অভিহিত করেছেন। (সুরা জুমার, আয়াত: ১৮)। ইসলামের এই শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে, যা সমস্যা সমাধানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।