পবিত্র হজ: ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম ফরজ ইবাদত
হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরআন মাজিদে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, ‘আল্লাহর তরফ থেকে সেসব মানুষের জন্য হজ ফরজ করা হয়েছে, যারা তা আদায়ের সামর্থ্য রাখে।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ৯৭)। এই আয়াতটি হজের ফরজ হওয়ার মৌলিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
হজের ঐতিহাসিক পটভূমি ও আহ্বান
পবিত্র কাবাঘর পুনর্নির্মাণের পর আল্লাহ তাআলা হজরত ইব্রাহিম (আ.)-কে হজের আহ্বান জানানোর নির্দেশ দেন। আল্লাহ বলেন, ‘আর তুমি মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা করে দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পদব্রজে এবং সর্বপ্রকার ক্ষীণকায় উটের পিঠে চড়ে; তারা দূরদূরান্তের পথ অতিক্রম করে আসবে।’ (সুরা-২২ হজ, আয়াত: ২৭)। এই নির্দেশ অনুসারে হজরত ইব্রাহিম (আ.) আবু কুবাইস পাহাড়ের চূড়া থেকে হজের আহ্বান জানান। আল্লাহ তাআলা এই আহ্বান সমগ্র বিশ্বে এবং রুহের জগতে পৌঁছে দেন। যেসব রুহ এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ‘লাব্বাইক’ বলেছিল, তারা হজ করার সুযোগ পাবে এবং তাদের হজ ‘মাকবুল’ বা কবুল হজ হিসেবে গণ্য হবে।
হজ মাবরুরের গুরুত্ব ও দোয়া
প্রিয় নবীজি (সা.) হজ মাবরুরের জন্য বিশেষ দোয়া করেছেন: ‘হে আল্লাহ! আমাদের হজ মাবরুর নসিব করুন, আমাদের পাপরাশি ক্ষমা করে দিন, আমাদের সৎ প্রচেষ্টা মূল্যায়ন করুন, আমাদের নেক আমলগুলো কবুল করুন এবং (ইহজগতে ও পরকালে) এমন লাভজনক ব্যবসায়ে সফলতা দিন, যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নয়।’ (মুসলিম ও তিরমিজি)। হজ মাবরুরের পুরস্কার সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হজ মাবরুরের পুরস্কার জান্নাত ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারে না।’ তাঁর কাছে হজ মাবরুরের সংজ্ঞা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছেন, ‘(হজে) মানুষকে খাবার খাওয়ানো, সালাম দেওয়া (শান্তি প্রতিষ্ঠা) এবং সুন্দর কথা বলা।’ (বুখারি: ২৮১৯, মুসলিম)।
হজ কবুলের শর্তাবলি ও প্রকারভেদ
হজ কবুল হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত পূরণ করা আবশ্যক। যদি নিয়ত বিশুদ্ধ না হয়, উদ্দেশ্য সঠিক না থাকে, হজের অর্থ হালাল বা বৈধ উপার্জন থেকে না হয়, হজের ফরজ, ওয়াজিব তথা আরকান-আহকাম সঠিকভাবে আদায় না করা হয়, অথবা হজের সময় কোনো নিষিদ্ধ কাজ করা হয়—তাহলে হজ বাতিল হতে পারে। হজ তিন ধরনের হতে পারে:
- হজে মাবরুর: সর্বোত্তম হজ, যা সব দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ ও মানদণ্ডে উত্তীর্ণ।
- হজে মাকবুল: কবুল হজ, অর্থাৎ যে হজ আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয়েছে।
- হজে মারদুদ: রদকৃত বা পরিত্যক্ত হজ, অর্থাৎ যে হজ গ্রহণযোগ্য হয়নি।
হজের সময় হাজিদের দোয়া কবুল হয় বলে বিশ্বাস করা হয়। হজের পর ৪০ দিন পর্যন্ত দোয়া কবুল হওয়ার আশা করা হয় এবং হাজি যত দিন গুনাহমুক্ত থাকবেন, তত দিন তাঁর দোয়া কবুল হতে থাকবে। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যাঁরা হজ পালন করবেন, আল্লাহ তাঁদের হজ কবুল করবেন এবং তাঁদের জন্য অফুরন্ত রহমত ও বরকত নির্ধারিত হবে।
হজের শিক্ষা ও সামাজিক প্রভাব
যাঁরা হজের শিক্ষা লাভে ধন্য হন, তাঁরাই প্রকৃত হাজি হিসেবে বিবেচিত। হজকে জীবন পরিবর্তনের এক অপূর্ব সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত এবং হজ-পরবর্তী জীবনে সেই শিক্ষা বজায় রেখে চলা আবশ্যক। এ ধরনের হাজির সংখ্যা বাড়লে দেশ ও জাতির মঙ্গল সাধিত হবে, জনমানুষের কল্যাণ হবে। অন্যথায়, হজ শুধু অর্থের অপচয়, সময়ের অপচয়, শক্তি-সামর্থ্যের অপব্যবহার এবং নফসের গোলামি বা আত্মপূজাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
হজ একটি ফরজ ইবাদত; এটি কোনো সার্টিফিকেট কোর্স নয় এবং কোনো পদ-পদবি বা উপাধিও নয়। হজ করার পর নিজ থেকেই নামের সঙ্গে ‘হাজি’ বিশেষণ যোগ করা সমীচীন নয়; তবে অন্য কেউ তা ব্যবহার করলে তাতে দোষ নেই। সর্বোপরি, হজের শিক্ষা অর্জন না করলে বা হজের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হলে হজ বাতিল বলে গণ্য হতে পারে।



