নাটোরে শতবর্ষী অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লার জীবনাবসান
নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার আলোচিত শতবর্ষী অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লা আর এই দুনিয়ায় নেই। রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজ বাসভবনে ১২০ বছর বয়সে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল ৯টায় বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।
জীবন ও সংগ্রামের গল্প
আব্দুর রহমান মোল্লা নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। দীর্ঘ ২২ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তিনি সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারান। কিন্তু এই প্রতিবন্ধকতা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। ধর্মপ্রাণ এই মানুষটি ইসলামের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি নিজের ৫ শতাংশ জমির ওপর একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করে জমিটি মসজিদের নামেই রেজিস্ট্রি করে দেন। এরপর নিজেই সেই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালনের সিদ্ধান্ত নেন।
কিন্তু বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার হওয়ায় যাতায়াতে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। চোখে দেখতে না পাওয়ায় এই জটিলতা নিরসনে আব্দুর রহমান নিজেই এক অভিনব বুদ্ধি বের করেন। তার নির্দেশে সন্তানেরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার পাশে দড়ি ও বাঁশ টাঙিয়ে দেন। প্রথম দিকে নাতিদের সহযোগিতায় যাতায়াতে অভ্যস্ত হওয়ার পর তিনি নিজেই নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন।
দেশব্যাপী আলোচনা ও প্রশংসা
দীর্ঘদিন ধরে একটি লাঠি ও টাঙানো দড়ি-বাঁশ অবলম্বন করে তিনি একাই মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত আজান দিতেন। ২০২৪ সালের মে মাসে গণমাধ্যমে তার এই সংগ্রামী জীবন ও একাগ্রতার সংবাদ প্রচার হলে তিনি দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন। অন্যের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে শতবর্ষী এক বৃদ্ধের এমন একাগ্রতা ও ধর্মনিষ্ঠা স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছিল।
মরহুমের ছেলে স্কুলশিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল জানান, দৃষ্টিশক্তি হারানোর কয়েক বছর পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে আব্দুর রহমান পবিত্র হজ পালন করেন। হজ থেকে ফিরে তিনি ইসলামের সেবায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিলিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তার এই নিষ্ঠা ও সংকল্প আজও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে।
শোক ও সমবেদনা
আব্দুর রহমান মোল্লার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। শোকবার্তায় তিনি বলেন, "বড়াইগ্রাম উপজেলার সবচেয়ে প্রবীণ এই মানুষটি অন্ধত্ব জয় করে দ্বীনের পথে যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, তা সত্যিই এক বিরল দৃষ্টান্ত।" তিনি আরও উল্লেখ করেন, আব্দুর রহমান মোল্লার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ধর্মপ্রাণ এই মানুষের বিদায়ে একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজসেবককে হারাল বড়াইগ্রামবাসী। সংসদ সদস্য মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। আব্দুর রহমান মোল্লার জীবন সংগ্রাম ও ধর্মীয় নিষ্ঠা স্থানীয় সম্প্রদায়ের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন এলাকাবাসী।



