অজুতে অঙ্গ ধোয়ার সময় নির্দিষ্ট দোয়া পড়া: ইসলামি ফিকহের স্পষ্ট ব্যাখ্যা
সাধারণ মানুষের মধ্যে অজু করার সময় প্রতিটি অঙ্গ ধোয়ার সঙ্গে আলাদা আলাদা দোয়া পড়ার একটি দীর্ঘকালীন প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। তবে ইসলামি ফিকহের আলোকে অজুর অঙ্গগুলো ধোয়ার সময় সুনির্দিষ্ট কোনো দোয়া পড়ার কোনো ভিত্তি নেই বলে বিশেষজ্ঞ আলেমরা উল্লেখ করেছেন।
ফিকহের দৃষ্টিতে অজুর দোয়ার অবস্থান
অজুর ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের কাছ থেকে যা প্রমাণিত নয়, তাকে ইসলামের অংশ মনে করা বা সুন্নাহর মর্যাদা দেওয়া বিভ্রান্তিকর হতে পারে। অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা অধিকাংশ আলেমের মতে একটি পছন্দনীয় কাজ বা সুন্নাহ হিসেবে গণ্য হয়।
তবে অজু চলাকালে বিভিন্ন অঙ্গ—যেমন মুখমণ্ডল, হাত বা পা ধোয়ার সময় যে দীর্ঘ দোয়াগুলো লোকমুখে প্রচলিত, তার সপক্ষে কোনো বিশুদ্ধ প্রমাণ নেই। ইমাম নববি তাঁর গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, “অজুর অঙ্গগুলো ধোয়ার সময় পড়ার মতো কোনো দোয়া বা জিকির আল্লাহর রাসুল থেকে প্রমাণিত হয়নি।” (ইমাম নববি, আল-আজকার, ১/২৮, দারুল ফিকর, বৈরুত: ১৯৯৪)
ইমাম ইবনুল কাইয়িমের জোরালো ব্যাখ্যা
ইমাম ইবনুল কাইয়িম বিষয়টি আরও জোরালোভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, অজুর শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ এবং শেষে শাহাদত পাঠ ছাড়া মাঝখানে কোনো বিশেষ দোয়া পড়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি লিখেছেন, “মহানবী এর কিছুই বলেননি এবং তাঁর উম্মতকেও শিক্ষা দেননি।” (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ, ১/১৯৫, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত: ১৯৯৪)
অজুর সমাপ্তি ও পরবর্তী আমলের গুরুত্ব
অজু শেষ করার পর গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিকির ও দোয়া প্রমাণিত আছে, যা অজুর আসল দোয়া হিসেবে বিবেচিত হয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যদি সুন্দরভাবে অজু করার পর পাঠ করে: ‘আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু’, তবে তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩৪)
সুনানে তিরমিজির বর্ণনায় এই দোয়ার সঙ্গে আরও একটি অংশ যুক্ত আছে, যা হলো: “আল্লাহুম্মাজ্আলনি মিনাত তাওয়াবিনা ওয়াজ্আলনি মিনাল মুতাতাহ্হিরিন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৫৫) অজু শেষে এই নিরেট তাওহিদের ঘোষণা এবং পবিত্রতা অর্জনের আকুতিই হলো সুন্নাহর প্রকৃত শিক্ষা।
সুন্নাহ বনাম নবউদ্ভাবিত রীতির পার্থক্য
ইসলামের মূল ভিত্তি দুটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে—প্রথমত, কেবল আল্লাহর ইবাদত করা; এবং দ্বিতীয়ত, কেবল সেই পদ্ধতিতে ইবাদত করা যা আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) প্রবর্তন করেছেন। ইবাদতের ক্ষেত্রে নিজের পছন্দ বা খেয়ালখুশি মতো কোনো রীতি যোগ করা বা বিয়োগ করা অনুমোদিত নয়।
অজুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা নিয়ে ফকিহদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে এটি সুন্নাহ। ইমাম নববি এ প্রসঙ্গে বলেন, “বিসমিল্লাহ বলা অজুর একটি সুন্নাহ, ওয়াজিব নয়। কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এটি বাদও দেয়, তবুও তার অজু শুদ্ধ হবে। ইমাম মালেক, আবু হানিফা এবং অধিকাংশ আলেম এই মত পোষণ করেছেন।” (ইমাম নববি, আল-মাজমু শারহুল মুহাজ্জাব, ১/৩৪৭, দারুল ফিকর, বৈরুত: ১৯৯৬)
সুতরাং, অজুর সময় অঙ্গ ধোয়ার সঙ্গে আলাদা দোয়া পড়ার প্রচলন ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে অমূলক, এবং মুসলিমদের জন্য সুন্নাহ অনুসরণ করাই উত্তম পথ।



