বজ্রপাত: প্রকৃতির মহাবিস্ময় ও কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়কর ঘটনা হলো মেঘের গর্জন বা বজ্রপাত। বিশেষ করে অন্ধকার রাতে প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে যখন মেঘের গুরুগুরু শব্দে চারপাশ কেঁপে ওঠে, তখন মানুষের মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এক ধরনের ভয়ের উদ্রেক হয়। এই ঘটনা শুধু ভয়ই সৃষ্টি করে না, বরং বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার দিক থেকেও তা গভীর তাৎপর্য বহন করে।
বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বজ্রপাত হলো মেঘের স্তরে স্তরে জমে থাকা বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক আধানের নিঃসরণ। এই বিদ্যুতের ঝলকানিতে বাতাসের তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যে ৩০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়, যা সূর্যের উপরিভাগের তাপমাত্রার চেয়েও প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। এই প্রচণ্ড উত্তাপে বাতাস হঠাৎ অত্যন্ত দ্রুত প্রসারিত হয় এবং পরে সংকুচিত হয়, যার ফলে যে তরঙ্গ সৃষ্টি হয় তাকেই আমরা মেঘের গর্জন হিসেবে শুনি।
বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের কান সাধারণত ১২০ থেকে ১৩০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ সহ্য করতে পারে, যা জেট বিমানের শব্দের তীব্রতার সমতুল্য। শব্দের তীব্রতা যদি ১৫০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায়, তবে কানের পর্দা ছিঁড়ে যেতে পারে। আর যদি শব্দের মাত্রা ১৮০ থেকে ২০০ ডেসিবেল হয়, তাহলে মানুষের ফুসফুস, পাকস্থলী ও অন্ত্র ছিন্নভিন্ন এবং হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হতে পারে।
কোরআনে বজ্রপাতের উল্লেখ
বজ্রপাতের প্রচণ্ড শব্দ প্রাচীন ইতিহাসের সেই সব জাতির কথা মনে করিয়ে দেয়, যারা অবাধ্যতার কারণে আকাশ থেকে আসা এক মহাগর্জনের মাধ্যমে ধ্বংস হয়েছে। কোরআনে সামুদ জাতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, “অতঃপর যখন আমার আদেশ এল, তখন আমি সালেহ ও তাঁর সঙ্গে যারা ইমান এনেছিল, তাদের আমার রহমতে উদ্ধার করলাম... আর যারা জুলুম করেছিল, এক প্রচণ্ড গর্জন তাদের পাকড়াও করল; ফলে তারা নিজ নিজ গৃহে উপুড় হয়ে পড়ে রইল।” (সুরা হুদ, আয়াত: ৬৬-৬৮)।
পবিত্র কোরআনের একটি সুরার নাম রাখা হয়েছে ‘আর-রাদ’ বা বজ্র। এই সুরায় বলা হয়েছে, “বজ্র তাঁর (আল্লাহর) সপ্রশংস মহিমা ঘোষণা করে এবং ফেরেশতারাও তাঁর ভয়ে ভীত হয়ে তা-ই করে। তিনি বজ্রপাত ঘটান এবং যাকে ইচ্ছা তা দিয়ে আঘাত করেন; অথচ তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, আর তিনি মহাশক্তিশালী।” (সুরা রাদ, আয়াত: ১৩)।
আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) যখন মেঘের গর্জন শুনতেন, তখন কথা বলা বন্ধ করে দিতেন এবং দোয়া পাঠ করতেন: “ইউসাব্বিহুর রাদু বিহামদিহি ওয়াল মালাইকাতু মিন খিফাতিহ।” অর্থাৎ, “পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর সপ্রশংস মহিমা বজ্র ঘোষণা করে এবং ফেরেশতারাও তাঁর ভয়ে তা-ই করে।” তিনি বলতেন, এটি পৃথিবীবাসীর জন্য এক কঠোর সতর্কবার্তা। (মালিক ইবনে আনাস, মুওয়াত্তা, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৫৬, দারুল গারব আল-ইসলামি, ১৯৯৯)।
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে বজ্র বা ‘রাদ’ হলো মেঘের দায়িত্বে নিয়োজিত একজন ফেরেশতার নাম। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ইহুদিরা নবীজির কাছে এসে বজ্র সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এটি আল্লাহর ফেরেশতাদের মধ্য থেকে একজন ফেরেশতা, যিনি মেঘমালার দায়িত্বে নিয়োজিত। তাঁর হাতে আগুনের চাবুক রয়েছে, যা দিয়ে তিনি আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী মেঘমালাকে তাড়িয়ে নিয়ে যান।” ইহুদিরা এই উত্তর শুনে বলেন, “আপনি সত্য বলেছেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩১১৭)।
সাইয়িদ কুতুব ফি জিলালিল কুরআন তাফসিরে লিখেছেন, বজ্রের এই ভয়াবহ শব্দ মূলত মহাজাগতিক সেই শৃঙ্খলারই প্রতিধ্বনি, যা মহান আল্লাহ তৈরি করেছেন। প্রতিটি নিখুঁত সৃষ্টি যেমন তার স্রষ্টার নিপুণ কারুকার্যের কথা ঘোষণা করে, বজ্রের এই নাদও তেমনই আল্লাহর অসীম ক্ষমতার মহিমা প্রচার করে। বিশাল এই মহাবিশ্বের প্রতিটি অণু-পরমাণু মহান আল্লাহর মহিমা ঘোষণা করে। আমরা হয়তো তাদের সেই ভাষা বা তসবিহ পাঠের ধরন সবসময় বুঝতে পারি না, কিন্তু সৃষ্টির প্রতিটি পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে স্রষ্টার একত্ববাদের সাক্ষ্য।



