রমজানের কাজা রোজা: বিলম্বের কারণ, বিধান ও ফিদইয়ার নিয়ম
রমজানের কাজা রোজা: বিলম্বের কারণ ও বিধান

রমজানের কাজা রোজা: বিলম্বের কারণ ও শরিয়তের বিধান

রমজান মাসে শরয়ি ওজরের কারণে রোজা ভাঙার অনুমতি থাকলেও পরে তা কাজা করা বাধ্যতামূলক। তবে অনেক সময় অজ্ঞতা, অলসতা বা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতার কারণে অনেকে সময়মতো এই কাজা আদায় করতে পারেন না। এমনকি এক রমজানের কাজা শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী রমজান চলে আসে, যা নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ে প্রশ্ন ও দ্বিধা দেখা দেয়।

বিলম্বের ধরন ও দায়বদ্ধতা

রমজানের রোজা কাজা করার ক্ষেত্রে বিলম্ব সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। প্রথমত, সঙ্গত কারণে বিলম্ব, যেমন অসুস্থতা যা পরবর্তী রমজান পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এক্ষেত্রে ব্যক্তি গুনাহগার হবেন না এবং সুস্থ হওয়ার পর সমপরিমাণ রোজা কাজা করাই যথেষ্ট। দ্বিতীয়ত, বিনা কারণে বা অলসতাবশত বিলম্ব করা। যিনি সক্ষম হওয়া সত্ত্বেও অবহেলা করে কাজা রোজাগুলো পরবর্তী রমজান পর্যন্ত পিছিয়ে দেন, তিনি শরিয়তের দৃষ্টিতে গুনাহগার হিসেবে গণ্য হবেন। কারণ ফরজ ইবাদত বিনা ওজরে বিলম্ব করা শরিয়তে নিষিদ্ধ। তবে গুনাহগার হলেও তাঁর ওপর ওই রোজাগুলোর কাজা রাখা ফরজ হিসেবে বহাল থাকে।

পরবর্তী রমজান আসার পর করণীয়

যদি এক রমজানের কাজা শেষ হওয়ার আগেই পরবর্তী রমজান চলে আসে, তবে ইসলামি আইনবিদ বা ফকিহদের মধ্যে দুটি প্রধান অভিমত পাওয়া যায়। হানাফি মত অনুযায়ী, ইমাম আবু হানিফা এবং তাঁর অনুসারীদের মতে, বিলম্বের কারণ যা-ই হোক না কেন, কেবল কাজা আদায় করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত কোনো কাফফারা বা ফিদইয়া দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তারা পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতকে দলিল হিসেবে উল্লেখ করেন, যেখানে আল্লাহ কেবল অন্য দিনে রোজা রাখার কথা বলেছেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অন্যদিকে, ইমাম মালেক, শাফেয়ি ও আহমদের মত অনুসারে, যদি কেউ বিনা ওজরে কাজা আদায়ে বিলম্ব করে পরবর্তী রমজানে পৌঁছে যায়, তবে তাঁকে কাজা আদায়ের পাশাপাশি প্রতিটি রোজার বদলে একজন মিসকিনকে ফিদইয়া বা খাবার দিতে হবে। তারা সাহাবি আবু হোরাইরা ও ইবনে আব্বাসের বর্ণনাকে এর স্বপক্ষে দলিল হিসেবে পেশ করেন। শাইখ ইবনে উসাইমিন মনে করেন, কোরআনের স্পষ্ট নির্দেশের বাইরে সাহাবিদের ব্যক্তিগত মতের ভিত্তিতে আর্থিক দণ্ড বাধ্যতামূলক করা কঠিন। তাই সতর্কতামূলকভাবে ফিদইয়া দেওয়া উত্তম, কিন্তু কেবল কাজা আদায় করলেই দায়ভার পূরণ হবে।

দীর্ঘস্থায়ী অক্ষমতা ও বিকল্প ব্যবস্থা

যাঁরা বার্ধক্য বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত, যার নিরাময় হওয়ার আশা কম, তাঁদের ক্ষেত্রে রোজার কাজা রাখা জরুরি নয়। এমন ব্যক্তি প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন অভাবীকে দুই বেলা তৃপ্তিভরে খাওয়াবেন। অনেক সময় নারী গৃহস্থালির কঠোর পরিশ্রম বা শারীরিক দুর্বলতার কারণে রোজা রাখতে পারেন না। শরিয়তের পরামর্শ হলো রাতে রোজার নিয়ত করা এবং দিনের বেলা কাজ করতে গিয়ে যদি রোজা রাখা অসম্ভব হয়, তবেই কেবল রোজা ভাঙা যাবে এবং পরে তা কাজা করতে হবে। তবে যদি শারীরিক সক্ষমতা একেবারেই না থাকে, তবে ফিদইয়া প্রদানের মাধ্যমে দায়মুক্তি সম্ভব।

শেষ কথা ও ইসলামের নমনীয়তা

ইমাম নববী উল্লেখ করেছেন, কাজা রোজা আদায়ে বিলম্বের ক্ষেত্রে যদি ওজর থাকে, তবে আলেমদের ঐক্যমত্য অনুযায়ী কেবল কাজাই যথেষ্ট। আর ওজর না থাকলে অধিকাংশ আলেমের মতে ফিদইয়া দেওয়া মুস্তাহাব বা উত্তম। আল্লাহর সহজতা পছন্দ করেন এবং বান্দার জন্য যা সাধ্যের অতীত তা চাপিয়ে দেন না। তাই অসুস্থ বা দুর্বলদের জন্য ইসলামি বিধান অত্যন্ত নমনীয়, যা মানবিক দিককে প্রাধান্য দেয়।