শাওয়াল মাসের গুরুত্ব ও ঈদুল ফিতরের ঐতিহাসিক পটভূমি
শাওয়াল মাসের গুরুত্ব ও ঈদুল ফিতরের ইতিহাস

শাওয়াল মাস: ইসলামি ইতিহাস ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসবের সূচনা

মুসলমানদের জন্য দুটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো পবিত্র ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। দ্বিতীয় হিজরি সনের ১৭ রমজানে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ তথা বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এর মাত্র ১৩ দিন পর, একই হিজরি বছরের ১ শাওয়াল তারিখে প্রথম ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। একই বছরে মদিনার ইহুদি বনু কাইনুকা গোত্রকে পরাজিত করার পর ১০ জিলহজ তারিখে প্রথম ঈদুল আজহা পালন করা হয়। অষ্টম হিজরি সনের ২০ রমজানে ইসলামের এক মহিমান্বিত বিজয় হিসেবে মক্কা বিজয় সংঘটিত হয়েছিল।

ঈদের তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

কোরবানির ঈদ হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর আত্মত্যাগের স্মৃতিবাহী একটি পবিত্র অনুষ্ঠান। অন্যদিকে, ঈদুল ফিতর সর্বজনীন আনন্দের উৎসব হিসেবে পরিচিত। ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবে বসন্তকালে নওরোজ এবং শরৎকালে মিহিরজান নামে দুটি উৎসব উদযাপিত হতো। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি জাতির ঈদ আছে, আর এটি আমাদের ঈদ।’ (বায়হাকি)। ঈদের আনন্দ ছোট-বড়, ধনী-গরিব সবার জন্য সমানভাবে বণ্টিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) উল্লেখ করেছেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি আনন্দের মুহূর্ত রয়েছে—একটি হলো যখন সে ইফতার করে আর দ্বিতীয়টি হবে যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে।’ (মুসনাদ)।

শাওয়াল মাসের বিশেষত্ব ও ধর্মীয় গুরুত্ব

আরবি চান্দ্রবর্ষের দশম মাস হলো শাওয়াল, যা ইসলামে বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। এই মাসের ১ তারিখে ঈদুল ফিতর উদযাপিত হয়। শাওয়াল মাস হজের তিন মাসের (শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ) প্রথম মাস হিসেবে পরিচিত। এ মাসের সঙ্গে রমজান, রোজা, সদকা ও জাকাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উল্লেখযোগ্য যে, তৃতীয় হিজরি সনের শাওয়াল মাসেই (২৩ মার্চ ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দ) ওহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বর্ণিত আছে, ‘আল্লাহ–তাআলা শাওয়াল মাসের ছয় দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি এই মাসে ছয় দিন রোজা রাখবে, আল্লাহ–তাআলা তাকে প্রতিটি সৃষ্ট জীবের সংখ্যার সমান নেকি দান করবেন, সমপরিমাণ গুনাহ মুছে দেবেন এবং পরকালে তাকে উচ্চ মর্যাদা প্রদান করবেন।’ (আল মুসনাদ)।

শাওয়াল মাসের ছয় রোজার ফজিলত

নবী করিম (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানে সিয়াম পালন করল এবং শাওয়াল মাসে আরও ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন পূর্ণ এক বছর রোজা পালন করল।’ (মুসলিম: ১১৬৪; আবু দাউদ: ২৪৩৩; তিরমিজি, সহিহ আলবানি)। চান্দ্রবর্ষে সাধারণত ৩৫৪ বা ৩৫৫ দিন হয়। প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব আল্লাহ–তাআলা কমপক্ষে ১০ গুণ করে দেন (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬০)। সেই হিসাবে রমজানের এক মাসের (৩০ দিনের) রোজা ১০ গুণ হয়ে ৩০০ দিনের সমান হয়। অবশিষ্ট ৫৪ বা ৫৫ দিনের জন্য আরও ছয়টি রোজা রাখা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘অতঃপর যখন তুমি (ফরজ) দায়িত্ব সম্পন্ন করবে, তখন (ইবাদতে) দাঁড়াবে এবং তোমার রবের প্রতিই মনোনিবেশ করবে।’ (সুরা ইনশিরাহ, আয়াত: ৭–৮)।

শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা রমজানের রোজা কবুল হওয়ার একটি লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত। আল্লাহ–তাআলা কোনো বান্দার আমল কবুল করলে তাকে অনুরূপ আরও আমল করার তওফিক দান করেন। নেক আমলের প্রতিদানের একটি রূপ হলো আবার আরও নেক আমল করার সৌভাগ্য অর্জন করা।

রোজা রাখার নিয়ম ও সময়সূচি

শাওয়াল মাসের যেকোনো সময় এ ছয়টি রোজা আদায় করা যায়। ধারাবাহিকভাবে বা মাঝে বিরতি দিয়েও তা রাখা যেতে পারে। উল্লেখ্য, রমজান মাসে ফরজ রোজা ছাড়া অন্যান্য রোজার নিয়ত সাহ্‌রির সময়ের মধ্যেই করতে হবে। এর আগে, অর্থাৎ ঘুমানোর আগে বা তারও আগে যদি রোজার দৃঢ়সংকল্প থাকে, তবে তা নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে এবং সাহ্‌রি না খেলেও রোজা রাখা যাবে। (শামি)।

যদি রমজানের কাজা রোজা বাকি থাকে, তবে তা পরবর্তী রমজানের আগপর্যন্ত যেকোনো সময়ে আদায় করা যাবে। সময় স্বল্প হলে কাজা রোজার আগে নফল রোজা রাখা বৈধ ও শুদ্ধ। তবে শাওয়ালের এ ছয়টি রোজা এ মাসের পর আদায় করার সুযোগ নেই; কিন্তু কাজা রোজা পরে আদায় করা যায়। সম্ভব হলে আগে কাজা রোজা আদায় করাই উত্তম। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১৬৬)।

শাওয়াল মাসের অন্যান্য সুন্নত ও কার্যক্রম

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার ওপর রমজানের যে কাজা রোজা বাকি থাকত, তা আমি পরবর্তী শাবান মাস ছাড়া আদায় করতে পারতাম না।’ (বুখারি: ১৯৫০; মুসলিম: ১১৪৬)। শুভ কাজের সূচনার জন্য শাওয়াল মাস অত্যন্ত উপযোগী হিসেবে বিবেচিত। সুযোগ থাকলে এ মাসে বিয়ে সম্পন্ন করা সুন্নত। অনুরূপভাবে শুক্রবার জামে মসজিদে এবং বড় সমাবেশে আক্‌দ অনুষ্ঠিত হওয়াও সুন্নত। আম্মাজান হজরত আয়েশা (রা.)-এর বিয়ে শাওয়াল মাসে মসজিদে নববিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। (মুসলিম)।

এ মাসে বিভিন্ন ইসলামি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মবর্ষ শুরু করে থাকে। ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এ মাসে নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম ও পাঠদান আরম্ভ করে। এইভাবে শাওয়াল মাস ইসলামি জীবনযাপনে নতুন সূচনা ও আধ্যাত্মিক উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে স্বীকৃত।