রোজার অনন্য মর্যাদা: আল্লাহর বিশেষ ঘোষণা
ইসলামে প্রতিটি নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব ও প্রতিদান থাকলেও রোজার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আল্লাহ তাআলা রোজার জন্য একটি অনন্য ঘোষণা দিয়েছেন, যা অন্যান্য ইবাদত থেকে এটিকে আলাদা করে তোলে।
রোজার বিশেষ প্রতিদানের হাদিস
মহানবী (সা.) বলেছেন, মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি পুণ্য ১০ গুণ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রোজা আলাদা, কারণ তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় দেব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৮৯৪)।
অন্য বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার ও কামাচার বর্জন করে, রোজা আমার জন্যই, আমি নিজেই তার পুরস্কার দেব; আর অন্যান্য নেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার ১০ গুণ।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯০৪)।
রোজার ফজিলত ও ব্যাখ্যা
ইমাম আওজায়ি (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, আল্লাহ রোজাদারকে যে প্রতিদান দেবেন তা মাপা হবে না, ওজন করা হবে না; অর্থাৎ বিনা হিসাবেই দেবেন। রোজার এত বড় ফজিলতের একটি কারণ হলো এটি ধৈর্যের ফল। আল্লাহ বলেন, ‘ধৈর্যধারণকারীরাই অগণিত সওয়াবের অধিকারী হবে।’ (সুরা জুমার, আয়াত: ১০)।
রোজাদারের জন্য বিশেষ পুরস্কার
১. কেয়ামতের দিন তৃষ্ণা নিবারণ: আল্লাহ তাআলা নিজের ওপর অবধারিত করে নিয়েছেন, যে ব্যক্তি তাঁর সন্তুষ্টির জন্য গ্রীষ্মকালে রোজার কারণে পিপাসার্ত থেকেছে, তিনি তাকে কিয়ামতের দিন তৃষ্ণার দিন পানি পান করাবেন। (মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস: ১০৩৯)। অন্য হাদিসে এসেছে, কেয়ামতের দিন রোজাদারদের জন্য একটি বিশেষ পানির হাউস থাকবে, যেখানে রোজাদার ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। (মুসনাদে বাজ্জার, হাদিস: ৮১১৫)।
২. জান্নাত লাভের পথ: মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একদিন রোজা রাখবে এবং সেই অবস্থায় তার মৃত্যু হবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৩৩২৪)। আবু উমামা (রা.) জান্নাতে যাওয়ার আমল জানতে চাইলে নবীজি (সা.) বলেন, ‘তুমি রোজা রাখো, কেননা এর সমতুল্য কিছু নেই।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ২৫৩০)।
রোজা কেন আলাদা?
প্রশ্ন উঠতে পারে, নামাজ বা হজ কি আল্লাহর জন্য নয়? অবশ্যই সব ইবাদত আল্লাহর জন্য। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য।’ (সুরা আনআম, আয়াত: ১৬২)। তবে রোজা আলাদা হওয়ার কারণ হলো:
- নামাজ, জাকাত বা হজ—এগুলো গোপন আমল নয়। নামাজ জামাতে পড়তে হয়, জাকাত প্রকাশ্যে দেওয়া সুন্নাত, এবং হজের জন্য নির্দিষ্ট পোশাক পরতে হয়। ফলে এসব ইবাদতের কথা মানুষ জেনে যায় এবং ইবাদতকারীর একটি পরিচয় তৈরি হয়।
- কিন্তু রোজা গোপন আমল। যে রোজা রাখে, অন্য কেউ তা জানার সুযোগ পায় না। কেউ যদি সাহরি ও ইফতার করে মাঝখানে গোপনে কিছু খেয়ে ফেলে, মানুষ তা বুঝতে পারে না।
- একজন রোজাদার তীব্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও যে কিছু খান না, তা একমাত্র আল্লাহর ভয়েই। এটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার একটি গোপন রহস্য। যেহেতু এখানে লৌকিকতার সুযোগ নেই, তাই আল্লাহ বলেছেন—‘রোজা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।’
যে আমলের প্রতিদান আল্লাহ নিজে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, সেই প্রতিদান যে কতটা মহান হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
