ঈদুল ফিতরের দিনের করণীয় ও বর্জনীয়: ইসলামের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৬, ১১:০১ পিএম। ঈদ শুধু আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; এটি সুন্নত অনুসরণ, ইবাদত বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সৌহার্দ জোরদারেরও এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। মুসলিম উম্মাহর জন্য ঈদ আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও ইবাদতের এক অনন্য দিন। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর আসে ঈদুল ফিতর, যা মুমিনদের জন্য পুরস্কারের বার্তা বহন করে। তাই এ দিনটি কেবল উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সুন্নত অনুযায়ী জীবনযাপন, ইবাদতে মনোযোগ এবং পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করার সুযোগও বটে। নিচে ঈদের দিনের করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
ঈদের দিনের করণীয় বিষয়সমূহ
- গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: ঈদের দিন সকালে গোসল করে পরিচ্ছন্ন হওয়া মুস্তাহাব। সাহাবায়ে কেরাম এ আমল করতেন। হজরত নাফে (রহ.) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন।’ (মুয়াত্তায়ে মালিক ৪৮৮)। আরও বর্ণনায় এসেছে, ‘তিনি উত্তমভাবে গোসল করতেন, সুগন্ধি ব্যবহার করতেন এবং সেরা পোশাক পরে ঈদের নামাজে যেতেন।’ (শরহুস সুন্নাহ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩০২)।
- উত্তম পোশাক ও সাজসজ্জা: ঈদের দিন নিজের সাধ্যমতো উত্তম পোশাক পরিধান করা মুস্তাহাব। হজরত নাফে (রহ.) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) দুই ঈদে সর্বোত্তম পোশাক পরিধান করতেন।’ (বাইহাকি ৬১৪৩)। উত্তম পোশাক মানেই নতুন পোশাক নয়; বরং নিজের কাছে থাকা ভালো পোশাক পরিধান করাই যথেষ্ট।
- সদকাতুল ফিতর আদায়: ঈদুল ফিতরের দিন যাদের নেসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, তাদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।’ (বুখারি ১৫০৯)। হজরত নাফে (রহ.) বলেন, ‘তারা ঈদের এক বা দুই দিন আগে ফিতরা আদায় করতেন।’ (আবু দাউদ ১৬০৬)। ঈদের সময়ে আদায় না হলে পরে অবশ্যই তা আদায় করতে হবে। (কিতাবুল আছল ২/২০৭; ফাতহুল কাদির ২/২৩১; রদ্দুল মুহতার ২/৩৬৮)।
- ঈদগাহে যাওয়ার আগে খেজুর খাওয়া: ঈদুল ফিতরের দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ, তাই এর প্রকাশ হিসেবে ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া মুস্তাহাব। হজরত আনাস (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) ঈদুল ফিতরের দিন খেজুর না খেয়ে বের হতেন না, এবং বেজোড় সংখ্যক খেতেন।’ (বুখারি ৯৫৩)।
- বেশি বেশি তাকবির পাঠ: হজরত নাফে (রহ.) বলেন, ‘ইবনে ওমর (রা.) ঈদগাহে যাওয়া থেকে ইমাম আসা পর্যন্ত তাকবির বলতে থাকতেন।’ (দারাকুতনী ১৭১৬)।
- ভিন্ন পথে যাতায়াত: হজরত জাবের (রা.) বলেন, ‘নবী (সা.) ঈদের দিন ভিন্ন পথে যাতায়াত করতেন।’ (বুখারি ৯৮৬)।
- পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া: ‘রাসুল (সা.) ঈদগাহে পায়ে হেঁটে যেতেন এবং ফিরতেন।’ (ইবনে মাজাহ ১২৯৫)।
- ঈদের নামাজ আদায়: ঈদের নামাজ দুই রাকাত ওয়াজিব, যা জামাতে আদায় করতে হয়। খোলা ময়দানে আদায় করা উত্তম। (ফতোয়ায়ে শামি, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৯)।
- একে অপরের জন্য দোয়া: সাহাবিরা বলতেন, ‘আল্লাহ আমাদের ও আপনাদের আমল কবুল করুন।’ (ফাতহুল বারি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৪৬)।
- ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়: হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) উল্লেখ করেন, সাহাবিরা এ বাক্যে শুভেচ্ছা জানাতেন— ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা।’ এছাড়া ‘ঈদ মোবারক, ‘ঈদুকুম সাঈদ’ ইত্যাদিও বলা যায়।
- এতিম ও অভাবীদের সহযোগিতা: ঈদের দিন এতিমের খোঁজখবর নেয়া, তাদের খাবার খাওয়ানো এবং সম্ভব হলে তাদের নতুন কাপড়ের ব্যবস্থা করে দেয়া চাই। এটা ঈমানদারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তারা আল্লাহর ভালোবাসায় অভাবগ্রস্ত, এতিম ও বন্দিকে খাদ্য দান করে।’ (সুরা দাহর: আয়াত ৮)।
- আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া: ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ও তাদের বাড়ি বেড়াতে যাওয়া চাই। পাশাপাশি প্রতিবেশীরও খোঁজখবর নিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতাপিতার সঙ্গে, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম-মিসকিন, প্রতিবেশী, অনাত্মীয় প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী পড়শী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাসদাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদের, যারা দাম্ভিক, অহংকারী।’ (সুরা নিসা : ৩৬)।
- মনোমালিন্য দূর করা: পারস্পরিক মনোমালিন্য দূর করা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করার উত্তম সময় ঈদের দিন। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানের জন্য বৈধ নয় যে, তার ভাইকে তিন দিনের বেশি সময় সম্পর্ক ছিন্ন রাখবে। তাদের অবস্থা এমন যে, দেখা-সাক্ষাৎ হলে একজন অন্যজনকে এড়িয়ে চলে। এ দুজনের মাঝে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ, যে আগে সালাম দেয়’ (মুসলিম : ৬৬৯৭)। তাই ঈদের দিন সব মান-অভিমান ভুলে একে অন্যের সঙ্গে আনন্দ প্রকাশ করা উচিত।
- আনন্দ প্রকাশ করা: ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা, যেখানে সুষ্ঠু বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের দিন আমার ঘরে এলেন, তখন আমার কাছে দুজন কিশোরী বুয়াস যুদ্ধের বীরদের স্মরণে গান গাচ্ছিল। তারা পেশাদার গায়িকা ছিল না। এরই মধ্যে আবু বকর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে এ বলে আমাকে ধমকাতে লাগলেন যে, নবীজি (সা.)-এর ঘরে শয়তানের বাঁশি? রাসুল (সা.) তার কথা শুনে বললেন, ‘হে আবু বকর! তাদের থাকতে দাও, প্রত্যেক জাতির উৎসব আছে, এটি আমাদের ঈদ।’ (বুখারি ৯৫২)।
ঈদের দিনের বর্জনীয় বিষয়সমূহ
- রোজা রাখা: রমজানের পুরো মাস রোজা রাখার পর ঈদ মোমিন বান্দার জন্য আনন্দের দিন। তাই আল্লাহ তায়ালা ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিন রোজা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ (মুসলিম ১১৩৮)।
- বিজাতীয় অনুকরণ: ঈদকে কেন্দ্র করে বিজাতীয় আচরণ মুসলিম সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। পোশাক-পরিচ্ছদে, চাল-চলনে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে অমুসলিমদের অনুকরণে লিপ্ত হয়ে পড়েছে মুসলমানদের অনেকেই। আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) সূত্রে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে অন্য জাতির অনুকরণ করে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (আবু দাউদ ৪০৩৩)।
- খোলামেলা পোশাক: ঈদের দিন নারীরা ব্যাপকভাবে বেপর্দা অবস্থায় রাস্তাঘাটে খোলামেলা ঘোরাফেরা করে। এ থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের অধীন মেয়েদেরও বিরত রাখতে হবে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন মুর্খতার যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ (সুরা আহযাব: আয়াত ৩৩)।
- অপচয়-অপব্যয়: ঈদের কেনাকাটা থেকে শুরু করে এ উপলক্ষে সবকিছুতেই অপচয়-অপব্যয় করা হয়। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২৭)। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, ‘তোমরা পানাহার কর, কিন্তু অপচয় করো না।’ (সুরা আরাফ: আয়াত ৩১)।
- মদ, জুয়া ও আতশবাজি: ঈদের আনন্দে মদ খাওয়া, জুয়া খেলা, আতশবাজি করা শরিয়তবিরোধী কাজ। শুধু ঈদ নয়, অন্য কোনো দিনও এসব করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! নিশ্চয় মদণ্ডজুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তিরগুলো তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর; যাতে সফলকাম হও।’ (সুরা মায়িদা: আয়াত ৯০)।
ঈদের দিনটি যেন শুধু বাহ্যিক আনন্দে সীমাবদ্ধ না থেকে ইবাদত, মানবিকতা ও সুন্নতের আলোকে উদযাপিত হয়—এটাই হওয়া উচিত প্রতিটি মুসলমানের লক্ষ্য। ঈদুল ফিতর কুরআন ও হাদিসের নির্দেশনা মেনে পালন করাই প্রকৃত আনন্দের পথ।


