ময়মনসিংহের তেরশ্রী মসজিদ: শতাব্দীর রহস্যময় স্থাপত্য নিদর্শন
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের তেরশ্রী গ্রামে অবস্থিত তেরশ্রী মসজিদ একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই মসজিদটি মোগল আমলে তৈরি করা হয়েছে, যদিও এর সঠিক বয়স নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেন এটি ৫০০ বছরের পুরোনো, আবার কেউ দাবি করেন ৭০০ বছর। মসজিদটির বিশাল আকারের কালো রঙের একটি বড় গম্বুজ এবং তার চারপাশে ১৩টি ছোট গম্বুজ রয়েছে, যা এর নামকরণের পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলীর বৈশিষ্ট্য
তেরশ্রী মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব এবং নির্মাণশৈলী মোগল যুগের স্থাপত্যকে নির্দেশ করে। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক স্বপন ধর মসজিদের ছবি বিশ্লেষণ করে বলেন, এটি মধ্যপ্রাচ্যের আফগান মসজিদগুলোর আদলে তৈরি। তিনি উল্লেখ করেন, মসজিদটি অবশ্যই ৫০০ বছরের বেশি পুরোনো এবং মোগল ঐতিহ্যের অংশ, যা ঈশা খাঁ ও তাঁর প্রভাবিত আফগান মুসলমানদের দ্বারা নির্মিত হতে পারে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে নানা কারুকার্য দেখা যায়, যদিও সময়ের সাথে সাথে অনেক কারুকাজ নষ্ট হয়ে গেছে।
স্থানীয়দের স্মৃতি ও ঐতিহ্য
সত্তরোর্ধ্ব মো. আজিজুল হক বলেন, তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শোনা তথ্য অনুযায়ী, মসজিদটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো। তিনি দাবি করেন, এটি মোগল আমলে তৈরি হয়েছে এবং দক্ষিণ গফরগাঁওয়ে এমন পুরোনো ও সুন্দর মসজিদ আর নেই। তেরশ্রী গ্রামের সরদার বংশের আশরাফ সিদ্দিকী ওরফে বাবলু সরদার জানান, মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা মির্জা সরদার, যিনি সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বলেন, এটি গফরগাঁওয়ের প্রথম মসজিদ হিসেবে বিবেচিত, এবং ১৩টি ছোট গম্বুজের 'শ্রী' বা সৌন্দর্যের কারণে এর নাম তেরশ্রী মসজিদ হয়েছে।
সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের চ্যালেঞ্জ
মসজিদের মুয়াজ্জিন আবদুস সামাদ বলেন, অনেক কারুকাজ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ২০০৪ সালে এটি সংস্কার করে রং করা হয়েছে। ভেতরে বেশি লোক নামাজ পড়তে না পারায় বাইরে কিছু অংশ বাড়ানো হয়েছে। মাওলানা রফিকুল ইসলাম হেলালী, যিনি চার বছর ধরে মসজিদে ইমামতি করছেন, তিনি উল্লেখ করেন যে মসজিদটি চুন-সুরকি ও বিভিন্ন কষ–জাতীয় জিনিস দিয়ে তৈরি, কারণ তখন সিমেন্টের ব্যবহার ছিল না। তিনি মুসলমানদের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য মসজিদটির খেয়াল রাখার আহ্বান জানান।
বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
মসজিদটিতে আগে ১৬ থেকে ১৮ জন মানুষ নামাজ পড়তে পারতেন, কিন্তু এখন সংস্কারের পর প্রায় ১০০ জনের মতো নামাজ পড়তে পারে। আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, সরকারিভাবে তদারকি না থাকায় এটি স্থানীয়ভাবেই রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। তিনি মনে করেন, সরকারি উদ্যোগ হলে মসজিদের সৌন্দর্য বাড়তে পারে। ময়মনসিংহ শশীলজ জাদুঘরের মাঠ কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, পুরাকীর্তি নিয়ে চলতি অর্থবছরে জরিপকাজ চলমান, এবং গফরগাঁওয়ে একটি দল জরিপ করেছে, যদিও প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ হয়নি।
তেরশ্রী মসজিদ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, বরং এটি ময়মনসিংহের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শনার্থীরা এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দেখতে আসেন, যা স্থানীয় সম্প্রদায়ের গর্বের বিষয়। এর রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
