ইতিহাসের ৪ রমজান: ইসলামের প্রথম সামরিক পতাকা থেকে ক্রুসেডারদের পতন
৪ রমজান: ইসলামের প্রথম পতাকা ও ক্রুসেডারদের পতন

ইতিহাসের ৪ রমজান: কৌশলগত মোড় পরিবর্তনের দিন

ইতিহাসের ক্যালেন্ডারে ৪ রমজান এক কৌশলগত মোড় পরিবর্তনের দিন হিসেবে চিহ্নিত। এই দিনে একদিকে মদিনায় ইসলামের প্রথম সামরিক পতাকা উড্ডীন হয়, অন্যদিকে ১৭০ বছরের ক্রুসেড দখলদারির অবসান ঘটে। এটি মুসলিম ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সূচনা করে।

ইসলামের প্রথম সামরিক পতাকা উড্ডীন

১ হিজরির ৪ রমজান মদিনার ইতিহাসে এক গৌরবোজ্জ্বল দিন হিসেবে স্বীকৃত। এই দিনে মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক পতাকা প্রদান করেন। সাদা রঙের সেই পতাকাটি বহন করছিলেন সাহাবি আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.)। নবীজির প্রিয় চাচা হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা.)-এর নেতৃত্বে ৩০ জন মুহাজির সাহাবির একটি দল লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল ‘সিফ আল-বাহর’-এর দিকে যাত্রা করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আবু জাহেলের নেতৃত্বে আসা কোরাইশদের একটি বাণিজ্যিক কাফেলা। যদিও মাজদি বিন আমর আল-জুহানির মধ্যস্থতায় সেদিন কোনো রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়নি, তবে এই অভিযানটি ছিল কোরাইশদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ, ২/৫৯৫, শারিকাতু মাকতাবাহ ও মাতবাআতু মুস্তফা আল-বাবি, মিশর, ১৯৫৫)

ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বড় বিজয়

আন্তাকিয়া বিজয় আইন জালুত যুদ্ধে মঙ্গোলদের পরাজিত করার পর সুলতান জাহির বাইবার্স নজর দেন উত্তর সিরিয়ার আন্তাকিয়া শহরের দিকে। আন্তাকিয়া ছিল ক্রুসেডারদের শক্তিশালী ঘাঁটি এবং মঙ্গোলদের প্রধান মিত্র। টানা ১০ বছর ধরে পরিকল্পনার পর ৬৬৬ হিজরির ৪ রমজান (১২৬৭ খ্রিষ্টাব্দ) সুলতান বাইবার্স এই নগরীটি জয় করেন। সালাহউদ্দিন আইয়ুবির বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পর এটি ছিল ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের সবচেয়ে বড় বিজয়। ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম ক্রুসেড যুদ্ধের সময় এটি মুসলিমদের হাতছাড়া হয়। ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীর এবং ১৩৬টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার বিশিষ্ট এই শহরটিকে তৎকালীন বিশ্বের দুর্ভেদ্য দুর্গ মনে করা হতো।

খলজি সাম্রাজ্যের উত্থান

ভারতের ইতিহাসে ৪ রমজান গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের দিন। এই দিনে দিল্লির খলজি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন ফিরোজ শাহ খলজি তাঁর ভাইপো ও জামাতা আলাউদ্দিন খলজির হাতে নিহত হন। পরবর্তীকালে আলাউদ্দিন খলজিই মঙ্গোলদের ভারত অভিযান রুখে দিতে ভূমিকা রাখেন। তিনি গুজরাট, চিতোর এবং দাক্ষিণাত্যের মতো বিশাল অঞ্চল জয় করেন। তাঁর সামরিক সাফল্যের কারণে তাঁকে 'সেকেন্ড আলেকজান্ডার' বলা হতো।

ওসমানীয়দের ইউরোপ অভিযান

১০৭৩ হিজরির (১৬৬২ খ্রিষ্টাব্দ) এই দিনে ওসমানীয়রা আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ট্রিয়ার হ্যাবসবার্গ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। উজিরে আজম ফাজিল আহমেদ পাশা কোপরুলু এক বিশাল বাহিনী নিয়ে অস্ট্রিয়ার দিকে অগ্রসর হন এবং ‘নিউহোসেল’ দুর্গ জয় করেন। ১৬৬৪ সালে ‘সেন্ট গথার্ড’ যুদ্ধের পরে ১০ আগস্ট ১৬৬৪ সালে স্বাক্ষরিত হয় ঐতিহাসিক ‘ফাসভার চুক্তি’ (Treaty of Vasvár)। এই চুক্তির মাধ্যমে ওসমানীয়রা ট্রান্সিলভানিয়ার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণই ফিরে পায় এবং অস্ট্রিয়ার সম্রাট যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২ লাখ গোল্ড ফ্লোরিন দেন।

এই ঘটনাগুলো ৪ রমজানকে ইসলামের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যা সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সাক্ষী।