রমজানে রোজা রেখে যেসব কাজ মাকরুহ ও নাজায়েজ, সতর্ক থাকুন
রমজানে রোজা রেখে মাকরুহ কাজ, সতর্কতা জরুরি

রমজানে রোজা রেখে যেসব কাজ মাকরুহ ও নাজায়েজ, সতর্ক থাকুন

মাহে রমজান রহমত, বরকত ও ক্ষমার মাস হিসেবে পরিচিত। এটি জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস, ধৈর্য ও সহমর্মিতার মাস এবং নেক আমলে প্রতিযোগিতার মাস। রমজান হলো আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সর্বোত্তম সময়। এ মাসে রোজা, নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারি। যে ব্যক্তি রমজানকে যথাযথভাবে কাজে লাগায়, সে সত্যিকার অর্থেই সফল। তাই আমাদের উচিত এই মহিমান্বিত মাসকে অবহেলা না করে ইবাদত ও নেক আমলের মাধ্যমে জীবনকে আলোকিত করা।

রোজার মূল উদ্দেশ্য ও তাকওয়া অর্জন

রোজার মূল উদ্দেশ্য শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; বরং আত্মসংযমের মাধ্যমে আল্লাহভীতি অর্জন করা। তাকওয়া মানে হলো নিজের ইচ্ছা-প্রবৃত্তির ওপর স্রষ্টার বিধানকে প্রাধান্য দেওয়া, তার নির্দেশ মেনে চলা এবং নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সচেতনভাবে বিরত থাকা। একজন সচেতন মুসলমানের জন্য প্রয়োজন নিজের ফরজ দায়িত্ব সম্পর্কে জানা, হারাম বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দ্বীনের নির্দেশনা অনুসরণ করা।

রোজাদারের জন্য মাকরুহ ও নাজায়েজ কাজের তালিকা

রোজা অবস্থায় কিছু কাজ মাকরুহ বা নাজায়েজ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা রোজার সওয়াব কমিয়ে দিতে পারে। নিচে এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

  1. নৈতিক ও সামাজিক গুনাহ: রোজাদারের জন্য মিথ্যা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, গীবত করা, চুগলখুরী করা, মিথ্যা কসম খাওয়া, অশ্লীল কাজ করা, অশ্লীল কথাবার্তা বলা, জুলুম করা, কারো সঙ্গে শত্রুতা রাখা, বেগানা নারীদের সঙ্গে মেলা-মেশা করা, বেগানা নারীকে দেখা, সিনেমা দেখা, মোবাইল ফোনে বেগানা নারী কিংবা বেগানা পুরুষের ছবি দেখা—এ সবই গুনাহ ও নাজায়েজ। এসব কাজ করলে যদিও রোজা নষ্ট হয় না, কিন্তু রোজা মাকরুহ হয় এবং রোজার সওয়াব কমে যায়।
  2. অনাবশ্যক চিবানো বা চেখে দেখা: রোজা অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে কোনো জিনিস চিবানো বা চেখে দেখা মাকরূহ। তবে বদমেজাজি স্বামীর পক্ষ থেকে কঠোরতা ও বাড়াবাড়ির আশঙ্কা থাকলে খাদ্য ও তরকারিকে জিহ্বার অগ্রভাগ দিয়ে চেখে তা ফেলে দেওয়ার অবকাশ রয়েছে।
  3. অতিরিক্ত ধৌতকরণ: পায়খানার রাস্তা পানি দ্বারা এত বেশি ধৌত করা যে, ভিতরে পানি পৌঁছে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এরূপ করা মাকরূহ।
  4. ওজুতে সতর্কতা: ওজুতে নাকে পানি দেওয়ার সময় অধিক পরিমাণে পানি পৌঁছানো মাকরূহ, কেননা এর ফলে কণ্ঠনালীতে পানি চলে যেতে পারে। একইভাবে কুলি করার সময় গড়গড়া করা মাকরূহ। সুতরাং রোজা অবস্থায় কুলি বা নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
  5. শাহওয়াতসহ চুম্বন ও আলিঙ্গন: রোজা অবস্থায় শাহওয়াত বা কামভাবের সঙ্গে স্ত্রীকে চুম্বন করা ও আলিঙ্গন করা মাকরূহ। তবে শাহওয়াত না থাকলে মাকরূহ হবে না।
  6. গোসলের সময় সম্পর্কে নির্দেশনা: রাতে স্ত্রী সহবাস করার পর সুবহে সাদেকের পূর্বে গোসল করা হয়নি, বরং সুবহে সাদেকের পর গোসল সম্পন্ন করা হয়েছে—এমতাবস্থায় রোজা মাকরূহ হবে না। তবে এমনটি না করাই উত্তম।
  7. দুর্বল মুসাফিরের রোজা: দুর্বল ও ক্লান্ত মুসাফির ব্যক্তির যদি রোজা রাখলে কষ্ট হয়, তবে তার জন্য তখন রোজা রাখা মাকরূহ।
  8. চুল ও নখ কাটা: চুল কাটালে বা নখ কাটলে রোজার কোনো সমস্যা হয় না, এটি জায়েজ।
  9. সফর অবস্থায় রোজা ভাঙা: সফর অবস্থায় মুসাফির ব্যক্তি রোজার নিয়ত করলে এবং সে দিনেই মুকিম হয়ে গেলে, তখন তার জন্য ওই দিনের রোজা ভেঙে ফেলা জায়েজ নেই।
  10. চোখে সুরমা বা ঔষধ: চোখে সুরমা লাগানো বা কোনো ঔষধ দেওয়ার দ্বারা রোজা ভাঙে না এবং মাকরুহও হয় না।

রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে আমরা আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের চেষ্টা করি। তাই উল্লিখিত মাকরুহ ও নাজায়েজ কাজগুলো থেকে বিরত থাকা প্রতিটি রোজাদারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব নির্দেশনা মেনে চললে রোজার পূর্ণ সওয়াব ও বরকত লাভ করা সম্ভব হবে।