খেজুর দিয়ে ইফতার: বিশ্বনবী (সা.)-এর সুন্নত ও বরকতের কারণ
রমজান মাস আত্মসংযম, তাকওয়া ও আনুগত্যের অনন্য প্রশিক্ষণের সময়। সারাদিন সিয়াম সাধনার পর সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে ইফতার রোজাদারের জন্য এক বিশেষ মুহূর্ত। এ সময়টিতে কী দিয়ে ইফতার করা উত্তম— এ প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে। বিশেষ করে খেজুর দিয়ে ইফতার করার বিষয়টি সুন্নত হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। কুরআন-হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য পথনির্দেশক।
ইফতার ও তাড়াতাড়ি রোজা ভাঙার ফজিলত
ইফতার অর্থ রোজা ভাঙা। রমজান বা অন্য সময় রোজা রাখার পর কিছু খেয়ে রোজা সম্পন্ন করাকেই ইফতার বলা হয়। রোজা শেষে বিলম্ব না করে দ্রুত ইফতার করা নবীজি (সা.)-এর সুন্নত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন— ‘যতদিন মানুষ তাড়াতাড়ি ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের মধ্যে থাকবে।’ (বুখারি ১৯৫৭, মুসলিম ১০৯৮)। এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা বরকত ও কল্যাণের কারণ। এটি রোজাদারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা তাদের আধ্যাত্মিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করে।
খেজুর দিয়ে ইফতার: সুন্নত ও বরকতপূর্ণ আমল
পানিসহ যে কোনো হালাল খাবার দিয়ে ইফতার করা যায়। খেজুর খেয়েই ইফতার করতে হবে— এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে আরবের সহজলভ্য ফল হিসেবে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইফতারে খেজুর গ্রহণ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা দিয়ে ইফতার করতে উৎসাহ দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে— হজরত সালমান ইবনে আমের (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— ‘তোমাদের কেউ যখন ইফতার করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে। নিশ্চয়ই এতে বরকত রয়েছে। যদি খেজুর না পায়, তবে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি পবিত্র।’ (তিরমিজি ৬৫৪)। এ হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়— খেজুর দিয়ে ইফতার করা সুন্নত এবং এতে বরকত রয়েছে। আর খেজুর না থাকলে শুধু পানি দিয়েও ইফতার করা সুন্নতসম্মত।
খেজুর ও অন্যান্য ফল: আল্লাহর নেয়ামতের নিদর্শন
পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন আবহাওয়া ও মাটির কারণে নানা ধরনের ফল-ফসল জন্মে। আমাদের দেশে খেজুর তুলনামূলক কম উৎপন্ন হলেও বর্তমানে আরব দেশ থেকে প্রচুর খেজুর আমদানি হয় এবং যা সারা বছর বাজারে সহজলভ্য। খেজুর কেনার সামর্থ্য থাকলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত অনুসরণ করে খেজুর দিয়ে ইফতার করা উত্তম। পাশাপাশি আমাদের দেশে সহজলভ্য ও পুষ্টিকর ফল দিয়েও ইফতার করা যায়। সব ফল-ফসলই আল্লাহর নেয়ামত ও তার কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ তাআলা বলেন— ‘আর তিনিই আসমান থেকে বর্ষণ করেছেন বৃষ্টি। অতঃপর আমি এ দ্বারা উৎপন্ন করেছি সব জাতের উদ্ভিদ... আর খেজুর বৃক্ষের মাথি থেকে (বের করি) ঝুলন্ত থোকা... নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন কওমের জন্য যারা ঈমান আনে।’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ৯৯)। এ আয়াতে খেজুরসহ নানা ফলকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা বিশ্বাসীদের জন্য শিক্ষণীয়।
উপসংহার: সুন্নতের অনুসরণ ও কৃতজ্ঞতা
খেজুর দিয়ে ইফতার করা ফরজ নয়, তবে তা সুন্নত ও বরকতময় আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণে খেজুর দিয়ে ইফতার করা উত্তম, আর খেজুর না থাকলে পানি দিয়েও ইফতার করা যথেষ্ট। মূল কথা হলো— সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা এবং আল্লাহর নেয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। রমজানের প্রতিটি ইফতার যেন সুন্নতের অনুসরণ, কৃতজ্ঞতা ও তাকওয়ার চর্চার মাধ্যমে আমাদের জীবনে বরকত বয়ে আনে— এটাই প্রতিটি মুসলিমের কাম্য। এই আমল আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি ও সামাজিক সম্প্রীতির দিকে ধাবিত করে।
