যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস: সর্বধর্ম সমন্বয় ও মানবতার মুক্তির দিশারী
দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় অতিবাহিত করেন। যখন আর্যদের বংশধররা সদাচারভ্রষ্ট হয়ে পড়েছিল এবং পুরাণের মর্মার্থ গ্রহণে অসমর্থ হয়ে সনাতন ধর্মকে বহু সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেছিল, তখন সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ও বিদ্বেষ ভারতকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করছিল। এই ঘোর সংকটকালে জ্যোতিঃস্তম্ভ স্বরূপ আবির্ভূত হন যুগাবতার মহাপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।
সর্বধর্ম সমন্বয়ের মহাবাণী
শুধু ভারতবর্ষের নয়, বিশ্ব মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ধর্মের বিরোধ মিটিয়ে সর্বধর্ম সমন্বয়কারী এই সাধক পুরুষ মহাযুগের প্রত্যুষে ঘোষণা করলেন ‘সকল ধর্মই সত্য, যত মত তত পথ’। তিনি জগতকে দিলেন সেই পরম সত্যের সন্ধান, যা শাস্ত্রে ও ধর্মে নিহিত থেকেও এতদিন প্রচ্ছন্ন ছিল। বিভিন্ন মত ও পথের সুকঠিন আধ্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধিলাভ করে তিনি নিশ্চিতভাবে জানালেন যে বিভিন্ন ধর্মমতগুলো একই সত্যে পৌঁছাবার বিভিন্ন পথ মাত্র। তাই যেকোনো ধর্মমতেই সাধনা করলে একই চরম লক্ষ্য বা ব্রহ্মপদে পৌঁছানো যায়।
অভূতপূর্ব শিক্ষাদান পদ্ধতি
শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা ও উপদেশদানের ধরন ছিল অভূতপূর্ব। দলে দলে লোক তাঁর উপদেশ শুনতে আসত। মানবজাতিকে যে জ্ঞানামৃত তিনি বিতরণ করে গেছেন, তা বিতরণের জন্য তিনি কখনো বাইরে কোথাও যাননি, বরং যারা তাঁর কাছে এসে উপদেশ গ্রহণ করবেন, তিনি তাদের জন্য অপেক্ষা করতেন। পদ্মফুল ফুটলে ভ্রমর যেমন নিজে নিজে মধু খুঁজতে আসে, সেরূপ তৃষিত ভক্তরা তাঁর উপদেশসুধায় পরিতৃপ্ত হবার আশায় সমবেত হতেন। শুধু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিরাই নয়, অনেক জ্ঞানীগুণী, সন্দেহবাদী এবং নাস্তিকও তাঁর বাণী শুনতেন।
তিনি সরল গ্রাম্য ভাষায় সকলকে উপদেশ দিতেন। শাস্ত্রের গভীর তত্ত্বগুলোকে অল্প কথায় সাধারণ দৃষ্টান্তের দ্বারা সহজ করে ব্যাখ্যা করতেন। তাঁর ব্যাখ্যাত তত্ত্বগুলো এতই প্রত্যক্ষ, সরল, হৃদয়স্পর্শী ও সহজবোধ্য ছিল, যেকোনো মানুষই সহজে বুঝতে পারত এবং তাদের হৃদয়ের অন্ধকার দূর হয়ে যেত। প্রায়-নিরক্ষর এক গ্রাম্য সাধকের মুখে গভীর তত্ত্বজ্ঞানের এমন সরল ব্যাখ্যা উচ্চশিক্ষিত শ্রোতাদের বিস্মিত করত।
শিষ্য বিবেকানন্দ ও বিশ্বজয়
শ্রীরামকৃষ্ণ কঠোর ত্যাগ-তপস্যায় যে আধ্যাত্মিক রত্নসমূহ সঞ্চয় করেছেন, সেসব মানবজাতিকে দেবার জন্য প্রথমেই নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন প্রিয় শিষ্য বিবেকানন্দের জীবনে। বিবেকানন্দের পূর্বাশ্রমের নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ। জগৎকল্যাণে কার্যসম্পাদনের জন্য মহামেধা ও মহাশক্তিমান নরেন্দ্রনাথকে দলনেতা মনোনীত করে শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের সমস্ত শক্তি তাঁর ভিতরে ঢেলে দেন। শ্রীরামকৃষ্ণের দ্বারা আচ্ছন্ন হয়েই নরেন্দ্রনাথ জগতের সমক্ষে বিবেকানন্দরূপে আত্মপ্রকাশ করেন।
শ্রীরামকৃষ্ণের তিরোধানের পর তাঁর মঙ্গলাশিস মস্তকে ধারণ করে বিশ্বহিতে কার্যসম্পাদনে নিযুক্ত হন বিবেকানন্দ। শুধু ভারতেই নয়, ভারতের বাইরেও শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যাখাত, অনুসৃত ও প্রচারিত সার্বজনীন হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতিকে জগৎসমক্ষে তুলে ধরে হিন্দুধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। গুরুর শিক্ষা, আদর্শ ও অমৃতবাণী ছড়িয়ে দেন আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে। বিবেকানন্দের নেতৃত্বে মৃতপ্রায় ভারতে দেখা দেয় এক নবজাগরণ।
নারীর মর্যাদা ও শক্তির পূজা
শ্রীরামকৃষ্ণ বাঙালিকে মাতৃমন্ত্রে দীক্ষা দেন, মাকে প্রত্যক্ষ চেনান। সমগ্র জগতই মায়ের প্রকাশ, তিনি প্রত্যেক নারীর শরীরে বাস করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রত্যেক নারীকে ‘জগন্মাত’ বা আদ্যাশক্তি মহামায়ার রূপ বলে মনে করতেন। সহধর্মিণী সারদাদেবীকে তিনি শুধু সাধনপথের সঙ্গিনীরূপেই গ্রহণ করেননি, আদ্যাশক্তি মহামায়ার দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী ষোড়শী রূপেও পূজা করেছিলেন।
আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডলের ভেতরে থেকেও সহধর্মিণীকে নিজের সাধনফল নিবেদন করার মধ্য দিয়ে নারীর অধিকারকে তিনি যে বিশেষ মর্যাদা দান করেছিলেন, তা সমগ্র বিশ্বমানবসমাজের ইতিহাসেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, নারীরা শক্তির আধার এবং পরিবার ও সমাজের উন্নতিতে তাদের জাগরণ অপরিহার্য। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে শ্রীমা সারদাদেবীকে অক্ষরজ্ঞান করিয়েছিলেন এবং সকল বিষয়ে শিক্ষা দিয়েছিলেন।
অমর জীবন ও বাণী
শ্রীরামকৃষ্ণের অত্যাশ্চর্য জীবন কাহিনী আলোচনা করলে এ সত্য সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায় যে তাঁর জন্ম, কর্ম, জীবন, অবদান প্রভৃতি সবই অতিমানবিক ঘটনা দ্বারা পরিব্যাপ্ত। যুগে যুগে এ উপমহাদেশে যেসব লোকোত্তর মহাপুরুষ জন্মগ্রহণ করে অমৃতত্ব লাভের পথনির্দেশ করে গেছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব তাঁদের অন্যতম। তাঁর জীবন ও বাণী আজও বিশেষ কল্যাণপ্রদ, যা শত শত ভক্ত ও মুমুক্ষুর জীবনকে উজ্জীবিত করে চলেছে।
