সাইদ বিন জুবাইরের জীবন ও শাহাদাত: হক ও বাতিলের চিরন্তন সংগ্রামের মহত্তম অধ্যায়
সাইদ বিন জুবাইরের জীবন ও শাহাদাত: হক-বাতিলের সংগ্রাম

সাইদ বিন জুবাইরের জীবন ও শাহাদাত: হক ও বাতিলের চিরন্তন সংগ্রামের মহত্তম অধ্যায়

অত্যাচারী শাসক হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ইমানের ওপর অটল থাকার যে নজির সাইদ বিন জুবাইর (রহ.) স্থাপন করেছেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত মজলুম মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। তাঁর জীবন ও শাহাদাত কেবল একটি বিয়োগান্তক ঘটনা নয়, বরং তা ছিল হক ও বাতিলের চিরন্তন সংগ্রামের এক মহত্তম অধ্যায়।

জন্ম ও শৈশব: সামাজিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা

সাইদ বিন জুবাইরের জন্মকাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশের মতে তিনি ৩৮ হিজরিতে খলিফা হাসান ইবনে আলি (রা.)-এর শাসনামলে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বনু আসাদ গোত্রের আজাদকৃত দাস বা মাওলা, গায়ের কৃষ্ণবর্ণ এবং হাবশি বংশোদ্ভূত। তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটে একজন দাসের সন্তানের জন্য জ্ঞানের উচ্চশিখরে পৌঁছানো ছিল চ্যালেঞ্জের। কিন্তু সাইদ বিন জুবাইর প্রমাণ করেছিলেন, ইসলামে আভিজাত্যের মানদণ্ড বংশ নয়, বরং জ্ঞান ও তাকওয়া। শৈশব থেকেই তিনি কোরআন ও সুন্নাহর গভীর পাঠে নিমগ্ন হন এবং কুফার সমৃদ্ধ পরিবেশে বেড়ে ওঠেন।

জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষকবৃন্দ: এক অনন্য সমন্বয়কারী

সাইদ বিন জুবাইর সরাসরি উম্মাহর পণ্ডিত হিসেবে পরিচিত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর তত্ত্বাবধানে দীর্ঘকাল অতিবাহিত করেন। তাঁর কাছে কোরআন, তাফসির ও ফিকহ শাস্ত্রের নিগূঢ় রহস্য উদঘাটন করেন। এমনকি ছাত্র থাকাবস্থায়ই তাঁর পাণ্ডিত্য দেখে ইবনে আব্বাস (রা.) তাকে নিজের উপস্থিতিতেই ফতোয়া ও হাদিস বর্ণনা করার অনুমতি দিতেন। বলতেন, “সাইদের জন্য এটা আল্লাহর অনেক বড় নেয়ামত, সে আমার সামনে কথা বলছে; যদি সে ভুল করে তবে আমি তা সংশোধন করে দেব।” এ ছাড়া আয়েশা (রা.), আব্দুল্লাহ বিন ওমর (রা.) এবং ইমাম জয়নুল আবেদিনের মতো মহান ব্যক্তিত্বদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন তিনি। সমকালীন আলেমদের মতে, সাইদ বিন জুবাইর ছিলেন তাঁর যুগের সকল জ্ঞানের এক অনন্য সমন্বয়কারী। খাসিফ ইবনে আব্দুর রহমান বলতেন, “সে যুগে মুজাহিদ ছিলেন তাফসিরের সেরা আলেম, আতা ইবনে আবি রাবাহ ছিলেন হজের মাসআলায় সেরা, সাইদ ইবনে মুসাইয়াব তালাকের মাসআলায় সেরা; কিন্তু সাইদ ইবনে জুবাইর ছিলেন এই সবগুলোতে শ্রেষ্ঠ।”

হাজ্জাজের সঙ্গে সংঘাত: অন্যায়ের প্রতিবাদে রাজপথে নামা

সাইদ বিন জুবাইর এমন এক সময়ে জীবন অতিবাহিত করছিলেন যখন উমাইয়া খিলাফতে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছে। ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের সীমাহীন উম্মাহকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। হাজ্জাজ বহু সাহাবি ও তাবেয়িদের ওপরও নিপীড়ন চালিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে সাইদ ইবনে জুবাইর কেবল গ্রন্থাগারে বসে ইলম চর্চাকেই যথেষ্ট মনে করেননি। বরং তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদে রাজপথে নামাকে আবশ্যকীয় মনে করেন। আব্দুল রহমান ইবনুল আশআসের নেতৃত্বে যখন হাজ্জাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে, তখন সাইদ ইবনে জুবাইর সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে শরিক হন। সাইদ বলেছিলেন, “আল্লাহর কসম, আমি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিনি যতক্ষণ না সে কুফরি কাজে লিপ্ত হয়েছে।”

পলায়ন ও ধরা পড়া: আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আত্মসমর্পণ

দাইরুল জামাজিম যুদ্ধে ইবনুল আশআসের বাহিনী পরাজিত হলে সাইদ ইবনে জুবাইর আত্মগোপনে চলে যান। তিনি প্রায় ১২ বছর মক্কা এবং তার আশপাশের অঞ্চলে লুকিয়ে ছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি ইস্পাহানেও আশ্রয় নিয়েছিলেন। হাজ্জাজের সৈন্যরা হন্যে হয়ে তাকে খোঁজে। যখন তাকে বলা হলো যে তিনি কেন আরও গভীর জঙ্গলে বা দূরদেশে পালিয়ে যাচ্ছেন না, তখন তিনি এক ঐতিহাসিক জবাব দিয়েছিলেন, “আমি পালাতে পালাতে এখন আল্লাহর কাছে লজ্জা পাচ্ছি; আল্লাহ আমার ভাগ্যে যা লিখে রেখেছেন তা-ই হবে।” অবশেষে হাজ্জাজের গুপ্তচররা মক্কার কাছে তাকে বন্দী করে এবং হাত-পা শিকলবদ্ধ করে ইরাকের ওয়াসিতে হাজ্জাজের সামনে হাজির করা হয়।

হাজ্জাজ ও সাইদের ঐতিহাসিক সংলাপ: বীরত্বগাথা

হাজ্জাজের দরবারে সাইদ ইবনে জুবাইরের কথোপকথন ইতিহাসের এক বীরত্বগাথা। যখন তাকে তাঁর নাম জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, “আমার নাম সাইদ ইবনে জুবাইর (অর্থ: মহান পিতার সুখী সন্তান)”। হাজ্জাজ উপহাস করে বলল, “না, তুমি হলে শাকি ইবনে কুসাইর (পাপিষ্ঠের হতভাগ্য পুত্র)”। সাইদ শান্তভাবে উত্তর দিলেন, “আমার মা আমার নাম তোমার চেয়ে ভালো জানেন।” হাজ্জাজ যখন তাকে হত্যার হুমকি দিলেন, সাইদ বললেন, “যদি মৃত্যু তোমার হাতে হতো, তবে আমি তোমাকেই উপাস্য বানিয়ে নিতাম।” হাজ্জাজ তাকে নানাভাবে প্রলোভন ও ভয় দেখানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সাইদ ছিলেন হিমালয়ের মতো অটল। এক পর্যায়ে হাজ্জাজ বললেন, “আমি তোমাকে এমনভাবে হত্যা করব যা আগে কখনো কাউকে করিনি।” সাইদ জবাব দিলেন, “তুমি যেভাবে আমাকে মারবে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তোমাকেও ঠিক সেভাবেই মারবেন। তুমি নিজের জন্য বেছে নাও কোন পদ্ধতি চাও।”

মহিমান্বিত শাহাদাত ও হাজ্জাজের পতন: জুলুমের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিবাদ

হত্যার চূড়ান্ত আদেশের আগে সাইদ ইবনে জুবাইর (রহ.) মুচকি হাসলেন। হাজ্জাজ অবাক হয়ে হাসির কারণ জানতে চাইলে তিনি বললেন, “আমি তোমার দুঃসাহস আর তোমার প্রতি আল্লাহর ধৈর্য দেখে হাসছি।” মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি শেষ দোয়া করেছিলেন, “হে আল্লাহ, আমার পরে আর কাউকে হত্যা করার ক্ষমতা তাকে দিও না।” ৯৫ হিজরির শাবান মাসে এই মহান আলেমকে জবাই করে শহীদ করা হয়। সাইদ ইবনে জুবাইরের শাহাদাতের পর হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েন। তিনি ঘুমাতে গেলেই স্বপ্নে সাইদকে দেখতেন এবং চিৎকার করে উঠতেন, “সাইদ ইবনে জুবাইরের সঙ্গে আমার কী শত্রুতা ছিল!” সাইদের শাহাদতের মাত্র ১৫ থেকে ৪০ দিনের মাথায় হাজ্জাজ এক যন্ত্রণাদায়ক রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। হাসান বসরি (রহ.) বলেছিলেন, “আল্লাহর শপথ, সাইদ ইবনে জুবাইর যখন মারা গেলেন, তখন দুনিয়ার প্রতিটি প্রান্তের মানুষ তাঁর ইলমের মুখাপেক্ষী ছিল।” তাঁর শাহাদত ছিল জুলুমের বিরুদ্ধে এক স্থায়ী প্রতিবাদ। আজ হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে ঘৃণিত নাম হিসেবে নিক্ষিপ্ত, কিন্তু সাইদ ইবনে জুবাইর প্রতিটি মুমিনের হৃদয়ে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে: “যে কেউ আল্লাহর পথে বের হয়, অতঃপর মৃত্যু তাকে পেয়ে বসে, তবে তার পুরস্কার আল্লাহর জিম্মায় অবধারিত হয়ে যায়।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১০০)