তারাবিহ নামাজ কত রাকাত পড়বেন? বিশ রাকাতের ঐতিহাসিক প্রমাণ ও ইমামদের মতামত
তারাবিহ নামাজের রাকাত সংখ্যা: বিশ রাকাতের প্রমাণ

তারাবিহ নামাজের রাকাত সংখ্যা: বিশ রাকাতের ঐতিহাসিক প্রমাণ

রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদতের একটি বিশেষ সময়। দিনের রোজার পাশাপাশি রাতের তারাবিহ নামাজ এই মাসের গুরুত্বপূর্ণ নফল ইবাদত হিসেবে বিবেচিত। প্রতি বছর রমজান আসলেই একটি প্রশ্ন বারবার উঠে আসে: তারাবিহ নামাজ কত রাকাত পড়া উচিত? ইসলামিক স্কলারদের মতে, তারাবিহ নামাজ বিশ রাকাত পড়াই উত্তম এবং এটি সুন্নতে মুআক্কাদা হিসেবে গণ্য।

হজরত ওমর (রা.)-এর সময়কালের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

তারাবিহ নামাজের প্রচলন সম্পর্কে জানা যায় যে, হজরত নবী কারিম (সা.) নিজে এই নামাজ আদায় করতেন। তবে জামাতের মাধ্যমে একত্রিতভাবে তারাবিহ পড়ার রীতি চালু করেন হজরত ওমর (রা.)। একটি বর্ণনা অনুসারে, রমজানের এক রাতে হজরত ওমর (রা.) বের হয়ে দেখতে পান যে, লোকজন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নামাজ পড়ছে। তিনি তখন সবাইকে এক ইমামের পিছনে জমা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.)-কে ইমাম নিযুক্ত করেন।

পরের রাতে যখন তিনি আবার বের হন, তখন দেখেন সবাই একই জামাতে নামাজ পড়ছে। হজরত ওমর (রা.) এটিকে 'উত্তম বিদআত' বলে অভিহিত করেন। এই জামাতে সাহাবায়ে কেরাম বিশ রাকাত তারাবিহ নামাজ আদায় করতেন, যা পরবর্তীতে একটি প্রমাণিত রীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

চার মাজহাবের ইমামদের মতামত

ইসলামের চার প্রধান মাজহাবের ইমামদের অধিকাংশই বিশ রাকাত তারাবিহর পক্ষে মত দিয়েছেন। হজরত ইবনে কুদামা (রাহ.) উল্লেখ করেছেন যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.), সুফিয়ান ছাউরি (রহ.), ইমাম আবু হানিফা (রহ.) এবং ইমাম শাফেঈ (রহ.)-এর মতে তারাবিহ নামাজ বিশ রাকাত।

ইমাম মালেক (রহ.)-এর একটি মত অনুযায়ী তারাবিহ ছত্রিশ রাকাত, তবে তার প্রসিদ্ধ মতও বিশ রাকাতের পক্ষে। ইমাম শাফেঈ (রহ.) বলেছেন, 'আমি মক্কাবাসীদের দেখেছি, তারা বিশ রাকাত তারাবিহ পড়েন।' ইমাম তিরমিজি (রহ.)-এর বক্তব্যেও হজরত ওমর (রা.) ও হজরত আলী (রা.)-এর আমলের উপর ভিত্তি করে বিশ রাকাতের পক্ষেই মত প্রকাশ করা হয়েছে।

বিশ রাকাতের দলিল ও প্রমাণ

বিশ রাকাত তারাবিহর সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল হলো সাহাবায়ে কেরামের আমল। হজরত ওমর (রা.)-এর নির্দেশে হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) সাহাবিদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়তেন। হজরত আলী (রা.)ও সাহাবি ও তাবেয়িদের জন্য বিশ রাকাত তারাবিহ পড়ার জন্য একজন ইমাম নিযুক্ত করেছিলেন।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন, 'হজরত উবাই ইবনে কা‘ব (রা.) সাহাবিদের নিয়ে বিশ রাকাত তারাবিহ পড়তেন, এটি সুপ্রমাণিত।' এছাড়া বিভিন্ন হাদিস সংকলন যেমন তিরমিজি, মুসনাদে আহমাদ প্রভৃতিতে এই বিষয়ে স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা

  • তারাবিহ নামাজ সুন্নতে মুআক্কাদা, অর্থাৎ জোরালো সুন্নত।
  • জামাতে আদায় করা উত্তম, তবে একা পড়াও জায়েজ।
  • ধীরে সুস্থে কিরাত পড়া এবং মনোযোগ সহকারে নামাজ আদায় করা আবশ্যক।
  • প্রতি দুই রাকাত পর সালাম ফেরানো এবং চার রাকাত পর পর সামান্য বিরতি নেওয়া মুস্তাহাব।

তারাবিহ নামাজ রমজানের রাতগুলোকে আধ্যাত্মিকভাবে সমৃদ্ধ করে। এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি অনন্য মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা সকল মুসলমানকে বিশ রাকাত তারাবিহ আন্তরিকতা ও তাকওয়ার সাথে আদায় করার তৌফিক দান করুন। আমিন।