দুনিয়ার চিন্তা বাড়লে আখিরাত দূরে সরে যায়: হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর গভীর বাণী
দুনিয়ার চিন্তা বাড়লে আখিরাত দূরে সরে যায়

দুনিয়ার চিন্তা বাড়লে আখিরাত দূরে সরে যায়: হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর গভীর বাণী

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম। মানুষের হৃদয় একটি অদ্ভুত ময়দান, যেখানে দুনিয়া ও আখিরাতের ভালোবাসা একসাথে সমানভাবে জায়গা করে নিতে পারে না। প্রখ্যাত তাবেঈ সাধক হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর একটি গভীর উক্তি আমাদের এই বাস্তবতা স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেন, ‘দুনিয়ার জন্য যত চিন্তা করবে, অন্তর থেকে পরকালের চিন্তা তত কমে যাবে। আর পরকালের জন্য যে পরিমাণ চিন্তা করবে, অন্তর থেকে দুনিয়ার চিন্তাই সে পরিমাণ দূর হয়ে যাবে।’

এই বাণী শুধু একটি নসিহত নয়; এটি ইমানের ভারসাম্য রক্ষার এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা। আজকের ব্যস্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও ভোগবাদী সমাজে এই বাণীর গুরুত্ব আরও বেশি প্রকট। কুরআন ও হাদিসে বারবার দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক করে আখিরাতমুখী জীবনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

কুরআনের আলোকে দুনিয়া ও আখিরাত

কুরআন মাজিদে দুনিয়া ও আখিরাতের সম্পর্ক নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

  • দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছু নয়। আর আখিরাতের আবাসই মুত্তাকিদের জন্য উত্তম। তবে কি তোমরা বুঝ না?’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ৩২)।
  • আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে আখিরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য তার ফসল বৃদ্ধি করে দেই। আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে, তাকে সেখান থেকে কিছু দেই; কিন্তু আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না।’ (সুরা আশ-শুরা: আয়াত ২০)।
  • দুনিয়া যেন ধোঁকা না দেয়: আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে।’ (সুরা ফাতির: আয়াত ৫)।

হাদিসের আলোকে দুনিয়ামুখিতা ও আখিরাতমুখিতা

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিসেও দুনিয়ার প্রতি আসক্তি ও আখিরাতের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।

  1. দুনিয়াপ্রীতির ভয়াবহতা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার ভালোবাসাই সব পাপের মূল।’ (বাইহাকি, শু‘আবুল ঈমান)।
  2. আখিরাতকে লক্ষ্য করলে দুনিয়াও সুশৃঙ্খল হয়: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যার লক্ষ্য আখিরাত, আল্লাহ তার অন্তরে সমৃদ্ধি দান করেন, তার কাজগুলো গুছিয়ে দেন এবং দুনিয়া তার কাছে অবনত হয়ে আসে।’ (তিরমিজি ২৪৬৫)।
  3. প্রকৃত সফলতা কার?: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।’ (মুসলিম ২৯৫৬)।

হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর বাণীর তাৎপর্য

হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.) ছিলেন তাবেঈ যুগের অন্যতম বিখ্যাত জাহিদ ও আল্লাহভীরু সাধক। তার জীবন ছিল দুনিয়ার চাকচিক্য ত্যাগ করে আখিরাতের প্রস্তুতিতে নিবেদিত। তিনি বুঝেছিলেন যে হৃদয় একটিই। সেখানে যদি দুনিয়ার দুশ্চিন্তা ভর করে, তবে আখিরাতের প্রস্তুতির জায়গা সংকুচিত হয়। আর যদি আখিরাতের ভয় ও আশা প্রবল হয়, দুনিয়ার অযথা উদ্বেগ দূর হয়ে যায়। এটাই ইমানের ভারসাম্য রক্ষার মূলমন্ত্র।

আমাদের করণীয়

আখিরাতমুখী জীবন গঠনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

  • প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত ও তাদাব্বুর: আখিরাতের স্মরণ হৃদয়কে নরম রাখে এবং আধ্যাত্মিকতা বৃদ্ধি করে।
  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ খুশু-খুজুর সঙ্গে আদায়: নামাজ আখিরাতমুখী জীবনের মূলভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
  • মৃত্যুচিন্তা ও কবরের স্মরণ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘স্বাদ নষ্টকারী (মৃত্যু)-এর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো।’ (তিরমিজি ২৩০৭)।
  • দান-সদকা বৃদ্ধি করা: দুনিয়ার সম্পদকে আখিরাতের পুঁজি বানানোই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।
  • দুনিয়ার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ: রিজিক আল্লাহর হাতে, যেমন আল্লাহ বলেন, ‘যমীনে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৬)।
  • সৎ সঙ্গ গ্রহণ: আখিরাতমুখী মানুষের সঙ্গ হৃদয়কে পরিশুদ্ধ রাখে এবং ইমানী শক্তি বৃদ্ধি করে।

দুনিয়া আমাদের গন্তব্য নয়; এটি একটি পরীক্ষার স্থান মাত্র। হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে হৃদয়ের দখলদারিত্ব যার, জীবন তার দিকেই মোড় নেয়। যদি হৃদয়ে আখিরাতের চিন্তা স্থান পায়, তবে দুনিয়ার ঝড়ও মানুষকে ভেঙে দিতে পারে না। আর যদি দুনিয়াই হৃদয়ের রাজা হয়ে যায়, তবে শান্তি অধরাই থেকে যায়। আসুন, আমরা দুনিয়াকে হাতের মধ্যে রাখি, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে নয়— আর আখিরাতকে রাখি হৃদয়ের গভীরে।