হজ ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ এবং মুসলমানের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইবাদত। এটি শুধু একটি সফর নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের অনন্য প্রশিক্ষণ। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান একই পোশাকে, একই কণ্ঠে ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি তুলে মহান রবের দরবারে হাজির হন— যা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের এক মহিমান্বিত দৃশ্য।
হজের প্রতিটি আমলের রয়েছে নির্দিষ্ট সময়, স্থান ও নিয়ম। এর মধ্যে কিছু আমল ফরজ, যা ছাড়া হজ আদায় হয় না; আবার কিছু আমল ওয়াজিব, যা ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দিলে দম বা কুরবানি আদায় করতে হয়। তাই একজন হাজীর জন্য হজের ফরজ ও ওয়াজিব আমলগুলো বিস্তারিতভাবে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হজের ৩ ফরজ
হজের মৌলিক ফরজ আমল তিনটি। এগুলোর কোনো একটি বাদ পড়লে হজ আদায় হবে না।
১. ইহরাম বাঁধা
হজ ও ওমরাহর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো ইহরাম। নির্ধারিত মিকাত থেকে হজের নিয়তে বিশেষ নিয়মে ইহরাম বাঁধতে হয়। ইহরাম পরিধানের মাধ্যমে একজন হাজী দুনিয়াবি অনেক বৈধ কাজ থেকেও বিরত থাকেন, যা আত্মসংযম ও আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের প্রতীক।
যদি সফর সরাসরি মক্কার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে বাংলাদেশ থেকেই ইহরাম বেঁধে রওনা হতে হয়। আর যদি আগে মদিনা বা অন্য কোথাও যাওয়া হয়, তাহলে মক্কায় প্রবেশের পূর্বে মিকাত থেকে ইহরাম বাঁধতে হবে।
ইহরামের ফরজ দুইটি:
- নিয়ত করা: হজের উদ্দেশ্যে অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করাই নিয়ত। মুখে এভাবে দোয়া করা যেতে পারে— 'আল্লাহুম্মা ইন্নি উরিদুল হাজ্জা ফাইয়াসসিরহু লি ওয়া তাক্বাব্বালহু মিন্নি।' অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমি হজের নিয়ত করলাম। আপনি আমার জন্য হজ সহজ করে দিন এবং আমার হজ কবুল করুন।'
- তালবিয়া পাঠ করা: 'লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা, ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারিকা লাক।' অর্থ: 'আমি হাজির, হে আল্লাহ! আমি হাজির। আপনার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, নেয়ামত ও রাজত্ব আপনারই। আপনার কোনো অংশীদার নেই।' পুরুষের জন্য তালবিয়া উচ্চস্বরে পাঠ করা সুন্নত, আর নারীরা নিচুস্বরে তালবিয়া পাঠ করবে। পরপর তিনবার পাঠ করা মুস্তাহাব।
২. আরাফার ময়দানে অবস্থান
আরাফায় অবস্থান হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— 'হজই হলো আরাফা।' ৮ জিলহজ মিনায় অবস্থানের পর হাজিরা ৯ জিলহজ সকালে আরাফার ময়দানের উদ্দেশ্যে রওনা হন। আরাফায় অবস্থানের আগে গোসল করা সুন্নত। মিনা থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে আরাফার ময়দান অবস্থিত, যদিও বাংলাদেশি হাজীদের তাবু সাধারণত আরও দূরে হয়ে থাকে।
৯ জিলহজ সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়ার পর আরাফায় অবস্থান শুরু হয়। এ সময় সামান্য সময় অবস্থান করলেও ফরজ আদায় হয়ে যায়। তবে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করা ওয়াজিব।
যদি মসজিদে নামিরায় ইমামুল হজের পেছনে নামাজ আদায় করা হয়, তাহলে দুই রাকাত জোহর ও দুই রাকাত আসর একসঙ্গে আদায় করতে হবে। অন্যথায় আলাদা আলাদা আদায় করতে হবে। সূর্যাস্তের পর হাজিরা মুজদালিফার উদ্দেশ্যে রওনা হন এবং সেখানেই (মুজদালিফায় গিয়ে) মাগরিব ও এশার নামাজ একসঙ্গে আদায় করতে হবে।
৩. তাওয়াফে জিয়ারত
হজের সর্বশেষ ফরজ আমল হলো তাওয়াফে জিয়ারত। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগেই এ তাওয়াফ সম্পন্ন করা উত্তম। বিলম্ব করলে দম বা কুরবানি ওয়াজিব হয়।
হজের ৬ ওয়াজিব
হজের কিছু গুরুত্বপূর্ণ আমল রয়েছে, যেগুলো ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে এগুলো ছেড়ে দিলে দম বা কুরবানি আদায় করতে হয়।
১. মুজদালিফায় অবস্থান
আরাফা থেকে সূর্যাস্তের পর হাজিরা মুজদালিফায় পৌঁছান। সেখানে মাগরিব ও এশার নামাজ এক আজান ও এক ইকামতে একসঙ্গে আদায় করতে হয়। মুজদালিফায় অবস্থান হজের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব আমল। এখানেই হাজিরা কংকর সংগ্রহ করেন এবং আল্লাহর জিকির ও দোয়ায় রাত অতিবাহিত করেন।
২. কংকর নিক্ষেপ করা
১০ জিলহজ মিনায় জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব। এটি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর শয়তানকে প্রত্যাখ্যান করার স্মৃতিবিজড়িত আমল। ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১১ জিলহজ সুবহে সাদিক পর্যন্ত প্রথম দিনের কংকর নিক্ষেপ করা যায়। ১১ ও ১২ জিলহজও তিন জামারাতে কংকর নিক্ষেপ করতে হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় জামারাতে কংকর নিক্ষেপের পর দোয়া করা উত্তম। ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগে মিনা ত্যাগ না করলে ১৩ জিলহজ কংকর নিক্ষেপ করতে হবে।
৩. কুরবানি করা
তামাত্তু ও কিরান হজ পালনকারীদের জন্য ১০ জিলহজ কুরবানি করা ওয়াজিব। এটি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ত্যাগের প্রতীক। তবে ইফরাদ হজ পালনকারীদের জন্য কুরবানি বাধ্যতামূলক নয়।
৪. মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা
কুরবানির পর হারামের সীমানার মধ্যে মাথা মুণ্ডানো বা চুল ছোট করা ওয়াজিব। এর মাধ্যমে হাজি ইহরামের অধিকাংশ নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্ত হয়ে যান। পুরুষদের জন্য মাথা মুণ্ডানো উত্তম, আর নারীরা সামান্য পরিমাণ চুল কাটবেন।
৫. সাঈ করা
তাওয়াফে জিয়ারতের পর সাফা ও মারওয়ার মধ্যবর্তী সাতবার আসা-যাওয়াকে সাঈ বলা হয়। এটি হজরত হাজেরা (আ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এক মহান আমল। সাফা পাহাড় থেকে কিবলামুখী হয়ে নিয়ত করে সাঈ শুরু করতে হয়। নির্দিষ্ট চিহ্নিত স্থানে পুরুষরা দ্রুতগতিতে চলবেন। সাত চক্কর পূর্ণ হলে একটি সাঈ সম্পন্ন হয়।
৬. বিদায়ী তাওয়াফ
হজের সব কার্যক্রম শেষ করে মক্কা ত্যাগের পূর্বে বিদায়ী তাওয়াফ করা ওয়াজিব। এটি কাবাঘরের সঙ্গে এক আবেগময় বিদায় এবং হজের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি। অনেক আলেমের মতে, হজ শেষে করা সর্বশেষ নফল তাওয়াফই বিদায়ী তাওয়াফ হিসেবে গণ্য হয়ে যায়।
হজ এমন এক ইবাদত, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে রয়েছে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণের শিক্ষা। ইহরামের সরল পোশাক মানুষকে দুনিয়ার অহংকার ভুলিয়ে দেয়, আরাফার ময়দান কেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, আর কাবাঘরকে ঘিরে তাওয়াফ মানুষের হৃদয়কে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে।
তাই হজে যাওয়ার আগে এর ফরজ ও ওয়াজিব আমলগুলো সঠিকভাবে জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ শুদ্ধভাবে হজ আদায় করাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় সফলতা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সহিহভাবে হজ আদায়ের তাওফিক দান করুন এবং কবুল হজের সৌভাগ্য নসিব করুন। আমিন।



