বিতর নামাজ ইসলামের পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ নামাজ। এই নামাজের তৃতীয় রাকাতে সুরা ফাতিহার পর একটি বিশেষ দোয়া পড়ার বিধান রয়েছে, যা দোয়া কুনুত নামে পরিচিত। হানাফি মাজহাব মতে, বিতর নামাজে দোয়া কুনুত পড়া ওয়াজিব। তবে অনেকেই দোয়া কুনুত মুখস্থ না থাকায় বা ভুলে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েন। এই প্রতিবেদনে দোয়া কুনুত না জানলে বা ভুলে গেলে করণীয় ও বিকল্প দোয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
দোয়া কুনুতের গুরুত্ব ও ওয়াজিব হওয়া
বিতর নামাজের তৃতীয় রাকাতে সুরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য সুরা মিলানোর পর দোয়া কুনুত পড়া হয়। এটি হানাফি মাজহাব অনুযায়ী ওয়াজিব। তবে প্রচলিত যে দোয়াটি আমরা পড়ি, সেটি মূলত সুন্নত। অর্থাৎ দোয়া কুনুত হিসেবে হুবহু একটি নির্দিষ্ট দোয়া পড়া ওয়াজিব নয়; বরং আল্লাহর কাছে দোয়া বা ক্ষমা প্রার্থনার যে কোনো শব্দ বা বাক্য পড়লেই ওয়াজিব আদায় হয়ে যায়। বিখ্যাত ফকিহ ইবরাহিম নাখয়ি (রহ.)-এর মতে, কুনুতের জন্য বিশেষ কোনো দোয়া নির্ধারিত নেই; যেকোনো দোয়া বা ইস্তিগফার পড়া যায়।
দোয়া কুনুত না জানলে বিকল্প দোয়া
যদি কারও প্রচলিত দোয়াটি মুখস্থ না থাকে, তবে নিম্নলিখিত দোয়াগুলো পড়া যেতে পারে:
- সুরা বাকারার ২০১ নম্বর আয়াত: رَبَّنَاۤ اٰتِنَا فِی الدُّنۡیَا حَسَنَۃً وَّ فِی الۡاٰخِرَۃِ حَسَنَۃً وَّ قِنَا عَذَابَ النَّارِ (রাব্বানা আতিনা ফিদ-দুনয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়া কিনা আজাবান নার)।
- আল্লাহুম্মাগ ফিরলি: তিনবার বললেও ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে।
- ইয়া রাব: তিনবার বলা যায়।
- রাব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা: رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ (রাব্বানা লা তুজিগ কুলুবানা বা'দা ইজ হাদাইতানা ওয়া হাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমাহ, ইন্নাকা আনতাল ওয়াহ্হাব) পড়া যাবে।
- হাদিসে বর্ণিত অন্য যেকোনো দোয়া: যেমন رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا ইত্যাদি।
কুনুতের পরিবর্তে সুরা ইখলাস পড়া যাবে?
অনেকে দোয়া কুনুতের পরিবর্তে তিনবার সুরা ইখলাস পাঠ করেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সুরা ইখলাস কোনো দোয়াসংবলিত সুরা নয়, বরং এটি আল্লাহর তাওহিদের বর্ণনা। কুনুতের মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর কাছে রোনাজারি ও প্রার্থনা করা। তাই সুরা ইখলাস না পড়ে যেকোনো মাসনুন দোয়া পড়া উচিত।
দোয়া কুনুত ভুলে গেলে বা ছেড়ে দিলে করণীয়
যদি কেউ ভুলবশত দোয়া কুনুত না পড়ে রুকুতে চলে যান, তাহলে ওয়াজিব ছুটে যাওয়ার কারণে তাকে নামাজের শেষে সিজদায় সাহু দিতে হবে। আর যদি কেউ ইচ্ছা করে দোয়া কুনুত না পড়েন কিংবা ভুলবশত বাদ পড়ার পর সিজদায় সাহু না দেন, তবে ওই নামাজ পুনরায় আদায় করা আবশ্যক।
প্রচলিত দোয়া কুনুত
বহুল প্রচলিত দোয়া কুনুতটি হলো:
আরবি: اللّهُمَّ إِنَّا نَسْتَعِينُكَ وَنَسْتَغْفِرُكَ وَنُؤْمِنُ بِكَ وَنَتَوَكَّلُ عَلَيْكَ وَنُثْنِيْ عَلَيْكَ الْخَيْرَ وَنَشْكُرُكَ وَلاَ نَكْفُرُكَ- وَنَخْلَعُ وَنَتْرُكُ مَنْ يَّفْجُرُكَ- اللّهُمَّ إِيَّاكَ نَعْبُدُ- وَلَكَ نُصَلِّيْ وَنَسْجُدُ- وَإِلَيْكَ نَسْعٰى وَنَحْفِدُ- نَرْجُو رَحْمَتَكَ وَنَخْشٰى عَذَابَكَ- إِنَّ عَذَابَكَ بِالْكُفَّارِ مُلْحِقٌ
উচ্চারণ: 'আল্লাহুম্মা ইন্না নাসতাইনুকা ওয়া নাসতাগফিরুকা- ওয়া নু'মিনুবিকা- ওয়া নাতাওয়াক্কালু আলাইকা- ওয়া নুছনি আলাইকাল খাইর-ওয়া নাশকুরুকা- ওয়ালা নাকফুরুকা, ওয়া নাখলাঊ ওয়া নাতরুকু মাইঁইয়াফঝুরুকা- আল্লাহুম্মা ইয়্যাকা না'বুদু- ওয়া লাকা নুসাল্লি ওয়া নাসঝুদু- ওয়া ইলাইকা নাসআ- ওয়া নাহফিদু নারঝু রাহমাতাকা- ওয়ানাখশা আজাবাকা- ইন্না আজাবাকা বিল কুফফারি মুলহিক্ব।'
অর্থ: 'হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আর আপনার উপর ইমান আনছি ও আপনার উপরই ভরসা করছি। আপনার শ্রেষ্ঠতম প্রশংসা করছি এবং (চিরকাল) আপনার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো। কখনো আপনার অকৃতজ্ঞ বা অবাধ্য হবো না। যারা আপনার অবাধ্য হয়, আমরা তাদেরকে বর্জন করে চলবো। হে আল্লাহ! আমরা একমাত্র আপনারই ইবাদত করি ও আপনারই জন্য নামাজ পড়ি, আপনারই জন্য সিজদা করি এবং সর্বদা আপনার আনুগত্যেরই প্রচেষ্টা করি এবং আপনার করুণার প্রত্যাশা করি। আর ভয় করি আপনার আজাবের। নিশ্চয়ই আপনার আজাব কাফেরদেরকে গ্রাস করে নিবে।' (আবু দাউদ মারাসিল- ১১৮ হা.৮৯, ইবনে আবী শাইবা-১/৩০১ হা. ৬৯৬৫ সহীহ লিগায়রিহী)



