জেনা-ব্যভিচারের তওবা নিয়ে যা বললেন শায়খ আহমাদুল্লাহ
সম্প্রতি একটি ইসলামি অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় ইসলামিক ব্যক্তিত্ব ও আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করেন— ‘আমি আমার বন্ধুদের প্ররোচনায় পড়ে জিনা বা ব্যভিচারের মত কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি। এখন এই পাপের জন্য আমার খুব অনুশোচনা হচ্ছে। আমার কি তওবা করার সুযোগ আছে? আল্লাহ তাআলা কি আমাকে ক্ষমা করবেন?’
এই প্রশ্নের উত্তরে শায়খ আহমাদুল্লাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শয়তানের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হলো নৈরাশ্য। মানুষকে যদি আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ করে দেওয়া যায়, তাহলে সেটাই শয়তানের সবচেয়ে বড় সফলতা। আর একজন ইমানদারের দায়িত্ব হলো কোনো অবস্থাতেই শয়তানকে এই জায়গায় সফল হতে না দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে ঘোষণা করেছেন, তাঁর রহমত থেকে কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না। তিনি মানুষের সব গুনাহ ক্ষমা করতে সক্ষম। পৃথিবীতে এমন কোনো পাপ নেই, যা আল্লাহ ক্ষমা করতে পারেন না। অর্থাৎ, একজন মানুষ যদি আন্তরিকভাবে তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাহলে ক্ষমার অযোগ্য এমন কোনো গুনাহ বাস্তবে নেই।
অনেকেই কুরআনের সেই আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেন, যেখানে বলা হয়েছে যে আল্লাহ শিরকের গুনাহ ক্ষমা করবেন না। এর সঠিক অর্থ হলো— কেউ যদি শিরক করার পর জীবিত অবস্থায় খাঁটি অন্তরে তওবা করে, অনুশোচনা করে এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তাহলে আল্লাহ তাকেও ক্ষমা করে দেন। কিন্তু যদি কেউ তওবা ছাড়া শিরকের অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে, তখন সেই পাপ আর ক্ষমা করা হবে না।
তাই কোনো তরুণ যদি ব্যভিচার বা অন্য কোনো বড় গুনাহে জড়িয়ে পড়ে এবং পরে নিজের ভুল উপলব্ধি করে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত হয় এবং ভবিষ্যতে সেই পাপে আর ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার তওবা কবুল করতে পারেন। একজন মুমিনের অন্তরে এই বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে থাকা উচিত। আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে হতাশ হওয়া কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
নবী করীম (সা.) বলেছেন, আদম সন্তানের প্রত্যেকেই ভুলকারী। নবীগণ ছাড়া পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যিনি সম্পূর্ণভাবে ভুল ও গুনাহ থেকে মুক্ত। মানুষ হিসেবে আমাদের সবার জীবনেই কমবেশি ভুল হয়, গুনাহ হয়। তবে ভুলকারী মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে ভুল করার পর আল্লাহর কাছে তওবা করে এবং নিজেকে সংশোধন করে।
অর্থাৎ ভালো মানুষ সে নয়, যার কখনো ভুল হয় না; বরং ভালো মানুষ সে, যে ভুল করার পর নিজের ভুল স্বীকার করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায় এবং সঠিক পথে ফিরে আসে।
এ কারণেই একজন মুমিনের উচিত নয় গুনাহ হয়ে যাওয়ার কারণে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া বা নিজেকে শেষ মনে করা। হতাশা ইমানদারের বৈশিষ্ট্য নয়। আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তার রহমত থেকে নিরাশ হয় কেবল অবিশ্বাসীরা।
আজ আমরা লক্ষ্য করি, পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত, সমৃদ্ধ ও সুখী বলে পরিচিত দেশগুলোর অনেকগুলোতেই আত্মহত্যার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। অথচ শুধু বৈষয়িক উন্নতি মানুষের প্রকৃত সুখ নিশ্চিত করতে পারেনি।
আমাদের নিজেদের সমাজের দিকেও তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কয়েক দশক আগে মানুষের জীবনযাত্রা আজকের মতো উন্নত ছিল না। এত সুযোগ-সুবিধা, প্রযুক্তি, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা ভোগ্যপণ্যের প্রাচুর্যও ছিল না। কিন্তু তখনকার মানুষের মধ্যে পারিবারিক বন্ধন, মানসিক প্রশান্তি ও জীবনের প্রতি সন্তুষ্টি অনেক বেশি ছিল।
বর্তমান সময়ে বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এর মূল কারণ কেবল অর্থনৈতিক বা সামাজিক সংকট নয়; বরং ইমানের দুর্বলতা এবং আল্লাহর রহমতের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলা।
মানুষ আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয় তখনই, যখন সে মনে করে তার জীবনের আর কোনো অর্থ নেই, তার সামনে আর কোনো আশা নেই। কিন্তু একজন মুমিন কখনো এমন চিন্তা করতে পারে না। কারণ সে জানে, যত বড় সংকটই আসুক না কেন, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়।
আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস একজন মুমিনকে সবচেয়ে কঠিন পরিস্থিতিতেও আশাবাদী রাখে। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেলেও, দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও, একজন মুমিন বিশ্বাস করে—আল্লাহ অবশ্যই তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করবেন।
তাই গুনাহ হয়ে গেলে হতাশ না হয়ে তওবার দরজা খোলা আছে—এই বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। নিজের ভুল স্বীকার করতে হবে, অনুতপ্ত হতে হবে এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, শয়তান চায় আমরা গুনাহের পরে হতাশ হয়ে যাই। আর আল্লাহ চান আমরা তওবা করে তার দিকে ফিরে আসি।
সুতরাং গুনাহ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমত তার চেয়েও বড়। তাই কখনো নিরাশ নয়, বরং সর্বদা আশাবাদী হয়ে আল্লাহর ক্ষমা ও দয়ার প্রত্যাশায় জীবন কাটানোই একজন মুমিনের পথ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে আন্তরিক তওবা করার তৌফিক দান করুন, তার রহমতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখার শক্তি দিন এবং আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আমিন।
সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল



