ছবি: প্রথম আলো
নবীজিকে ভালোবাসার প্রকৃত দাবি
নবীজিকে ভালোবাসার প্রকৃত দাবি হলো প্রতিটি বিষয়ে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা। যেমন কোরআন তেলাওয়াত, হাদিস পাঠ, সুন্নাহর ওপর আমল, নবীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভের আকাঙ্ক্ষা পোষণ এবং তাঁর সিরাতের আলোচনা করা।
সাহাবিরা ছিলেন নবীজিকে ভালোবাসার সার্থক ও জীবন্ত নমুনা এবং তাঁর প্রত্যক্ষ সাক্ষী। তারা সেই অসম ভালোবাসার কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন।
সাহাবিদের ভালোবাসার বিতর্ক
কা’ব ইবনে উজরা (রা.) বলেন, ‘মসজিদে নববিতে মিম্বরের সামনে আমরা বসা ছিলাম। মুহাজির, আনসার এবং বনু হাশিম (নবীবংশের) সাহাবিদের তিনটি পৃথক দল ছিল মজলিশে। কথা প্রসঙ্গে বিতর্ক সৃষ্টি হলো, আমাদের মধ্যে কারা নবীজির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও প্রিয়পাত্র।’
কা’ব বলেন, ‘আমরা বললাম, “আনসাররা। আমরা তাঁর প্রতি ইমান এনেছি, আনুগত্য করেছি, একসঙ্গে জিহাদ করেছি, শত্রুর মোকাবিলা করেছি। কাজেই আমরা নবীজির বেশি প্রিয় ও সর্বাপেক্ষা ঘনিষ্ঠ।”
মুহাজির ভাইয়েরা বললেন, “আমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সন্তুষ্টির জন্য হিজরত করেছি, নিজ গোত্র ও স্ত্রী-সন্তান পরিত্যাগ করেছি। নবীজি যেখানে গিয়েছেন আমরাও গিয়েছি এবং তিনি যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, আমরাও করেছি। তাই আমরা তাঁর ঘনিষ্ঠ ও প্রিয়পাত্র।”
বনু হাশিমের গর্বভরে বললেন, “আমরা নবীবংশের লোক। তিনি যেখানে গিয়েছেন আমরাও গিয়েছি, প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। কাজেই বংশগত ও আত্মিক দিক থেকে আমরাই তাঁর ঘনিষ্ঠ ও পরম প্রিয়।”’
নবীজির ফয়সালা
‘সাহাবিদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসার এই বিতর্ক যখন চলছিল, ঠিক তখন নবীজি (সা.) ঘর থেকে বেরিয়ে সেই মজলিশে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা কী আলোচনা করছিলে?” লুকোচুরি না করে আমরা যার যার বক্তব্য তাঁকে বললাম।
তিনি প্রথমে আনসার সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমরা যা বলেছ, একদম সঠিক ও সত্য বলেছ। তোমাদের কথায় প্রতিবাদ করতে পারে, এমন কে আছে?” মুহাজিরদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাঁরা যা বলেছে, সঠিক বলেছে। তাঁদের কথা অস্বীকার করতে পারে, এমন কেউ নেই।” তারপর বনু হাশিমের দিকে ফিরে বললেন, “তাঁরাও যথার্থ বলেছে, তাঁদের কথা খণ্ডন করতে পারে এমন কেউ নেই।”’
সবশেষে তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, আমি কি তোমাদের এই বক্তব্যের একটা রায় প্রদান করব না, যাতে সবাই সন্তুষ্ট হতে পারো?’ আমরা বললাম, ‘আল্লাহর রাসুল, আমাদের মাতা-পিতা আপনার প্রতি উৎসর্গিত হোন, আপনি অবশ্যই এর একটি ফয়সালা করে দিন।’
তিনি বললেন, ‘হে আনসার সাহাবিরা, আমি তো তোমাদেরই ভাই।’ আনসাররা তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে উচ্চকণ্ঠে তাকবির দিতে লাগলেন। নবীজি এবার বললেন, ‘হে মুহাজিররা, আমি তো তোমাদেরই একজন।’ এ কথা শুনে মুহাজিরদের প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল এবং তাঁরাও খুশিতে তাকবির দিতে লাগলেন।
নবীজি এবার তাঁর নিজের বংশের লোকদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘হে বনু হাশিম, তোমরা তো আমার আপন রক্তের লোক, আমারই স্বজন এবং তোমরা দুনিয়া ও আখেরাতে আমার সঙ্গেই থাকবে।’
কা’ব ইবনে উজরা আরও বলেন, ‘নবীজি (সা.)-এর এই যুগান্তকারী ফয়সালা শোনার পর আমরা প্রত্যেকে যার যার শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পেয়ে খুশিমনে বৈঠক শেষ করে উঠলাম। সবার অন্তর যেন নবীজির প্রতি গভীর ভালোবাসা, তৃপ্তি ও আনন্দে ভরপুর হয়ে উঠেছিল।’ (তাবারানি, আল-মুজামুল কাবির, ১৯/১৩৮, মাকতাবাতু ইবনে তাইমিয়াহ, কায়রো, ১৯৯৪)
নবীজিকে ভালোবাসার গুরুত্ব
নবীজিকে ভালোবাসা ছাড়া কোনো মুমিনের ইমান পূর্ণতা পায় না। এক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় হই।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৫)
তাই নবীজির প্রতি আমাদের ভালোবাসা হতে হবে পৃথিবীর অন্য সবকিছুর ঊর্ধ্বে, এমনকি নিজের জীবনের চেয়েও বেশি।
ইলিয়াস মশহুদ : লেখক ও গবেষক।
আরও পড়ুন: আয়েশার সঙ্গে যেভাবে গল্প করতেন নবীজি, ১৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রথম আলোর খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
ইসলাম থেকে আরও পড়ুন: মহানবী (সা.), নবীজি (সা.), হাদিস, সাহাবিদের কথা, সাহাবি, বুখারি হাদিস, সিরাত



