ইসলাম ও জীবন ডেস্ক: অভাব-অনটন, দারিদ্র্য বা আর্থিক সংকট মানবজীবনের একটি বাস্তবতা। ধনী-গরিব, ছোট-বড়—যে কেউ জীবনের কোনো না কোনো সময় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। ইসলাম শিক্ষা দেয়, রিজিকের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাই জীবিকা অর্জনের জন্য বৈধ উপায়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে এবং এমন কিছু আমল করতে হবে, যা রিজিকে বরকত আনে ও সংকট দূর করে।
অভাব-অনটন থেকে মুক্তির ৪টি আমল
কুরআন ও সুন্নাহ আমাদের এমন কিছু আমলের শিক্ষা দিয়েছে, যা শুধু আখিরাতের সওয়াবই নয়, দুনিয়ার জীবনেও কল্যাণ, প্রশস্ত রিজিক ও মানসিক প্রশান্তির কারণ হতে পারে। তাহলো—
১. বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
গুনাহ মানুষের জীবনে বরকত কমিয়ে দেয়, আর তাওবা ও ইস্তিগফার আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন— “আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিতে সমৃদ্ধ করবেন।” (সুরা নুহ: আয়াত ১০–১২) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার জন্য প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেন, সব দুশ্চিন্তা দূর করেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।” (আবু দাউদ ১৫১৮)
২. নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া
নামাজ কেবল ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্ককে দৃঢ় করে এবং জীবনে বরকত নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন— “তুমি তোমার পরিবারকে নামাজের আদেশ দাও এবং নিজেও এর ওপর অবিচল থাক। আমি তোমার কাছে রিজিক চাই না; বরং আমিই তোমাকে রিজিক দিই।” (সুরা ত্বহা: আয়াত ১৩২) যে ব্যক্তি নামাজকে অগ্রাধিকার দেয়, আল্লাহ তার জীবনে বরকত দান করেন এবং তার অন্তরে প্রশান্তি দান করেন।
৩. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। এটি রিজিক বৃদ্ধিরও একটি মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক প্রশস্ত হোক এবং তার আয়ুতে বরকত হোক, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (বুখারি ৫৯৮৬, মুসলিম ২৫৫৭)
৪. নিয়মিত দান-সদকা করা
অনেকে মনে করেন দান করলে সম্পদ কমে যায়। অথচ ইসলাম শিক্ষা দেয়, আল্লাহর পথে ব্যয় করলে আল্লাহ তার উত্তম প্রতিদান দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন— “তোমরা যা কিছু ব্যয় কর, তিনি তার পরিবর্তে আরও দান করেন। তিনিই সর্বোত্তম রিজিকদাতা।” (সুরা সাবা: আয়াত ৩৯) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— “দান-সদকা কখনো সম্পদ কমিয়ে দেয় না।” (মুসলিম ২৫৮৮)
রিজিকে বরকত লাভের জন্য আরও কিছু করণীয়
- সর্বদা হালাল উপার্জনের চেষ্টা করা।
- সুদ, ঘুষ, প্রতারণা ও হারাম আয় থেকে দূরে থাকা।
- আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল (ভরসা) রাখা।
- নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া করা।
- ফজরের পর অলসতা পরিহার করে জীবিকার জন্য চেষ্টা করা।
- পিতা-মাতার সেবা ও দোয়া লাভের চেষ্টা করা।
- অপ্রয়োজনীয় অপচয় ও বিলাসিতা থেকে বিরত থাকা।
- প্রতিটি নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
রিজিক বৃদ্ধি ও অভাব-অনটন থেকে মুক্তির প্রকৃত চাবিকাঠি কেবল বেশি অর্থ উপার্জন নয়; বরং আল্লাহর আনুগত্য, হালাল উপার্জন এবং বরকতময় জীবনযাপন। ইস্তিগফার, নামাজ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং নিয়মিত দান-সদকা—এই চারটি আমল কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এমন গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল, যা একজন মুমিনের জীবনে কল্যাণ, প্রশস্ত রিজিক ও মানসিক প্রশান্তির কারণ হতে পারে। আসুন, আমরা অভাবের সময় হতাশ না হয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখি, বৈধ উপায়ে জীবিকা অর্জনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করি এবং কুরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত এই আমলগুলোকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ বানাই। আল্লাহ তাআলা আমাদের রিজিকে বরকত দান করুন, হারাম থেকে হেফাজত করুন এবং তার অশেষ অনুগ্রহে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করুন। আমিন।



