আজাদ আবুল কালামের জোরালো দাবি: টেলিভিশন-বেতারে স্বায়ত্তশাসন ও শিল্প-সংস্কৃতিতে সংস্কার চাই
বাংলাদেশের বিশিষ্ট অভিনেতা ও নির্মাতা আজাদ আবুল কালাম টেলিভিশন ও বেতার খাতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, টেলিভিশন ও বেতারের পুরো প্রক্রিয়া বদলানো উচিত, কারণ এখানে প্রযোজক, পরিচালক ও উচ্চপদস্থরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি নীতিমালা রয়েছে, এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা যায়, তা ভাবা সরকারের দায়িত্ব।
সরকারের ভূমিকা ও বাক্স্বাধীনতা
আজাদ আবুল কালাম স্পষ্ট করে বলেন, যদি সরকার টেলিভিশন-বেতার থেকে ফায়দা লুটতে বা জয়গান শুনতে চায়, তাহলে কখনোই স্বায়ত্তশাসন সম্ভব হবে না। তিনি বিশ্বাস করেন, বাক্স্বাধীনতা বা ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনে সরকারের আস্থা থাকলে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বায়ত্তশাসন আনা উচিত। এটি একটি বড় সিদ্ধান্ত, এবং সরকার এই দিকে যাবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সরকারি অনুদান ও দক্ষতা বিবেচনা
সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রে আজাদ আবুল কালাম বলেন, অতীতে যারা অনুদান পেয়েছেন, তাদের বেশির ভাগেরই রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল। তিনি দাবি করেন, এই জায়গাগুলোতে নির্মোহ ও নির্লিপ্ত মানুষ দরকার। রাজনীতি নয়, কনটেন্ট এবং ব্যক্তির দক্ষতাই হওয়া উচিত মূল বিবেচ্য। তবে তিনি সতর্ক করে দেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যারা ধারণ করবে না, তাদের প্রথমেই বাদ দেওয়া উচিত। একাত্তরের চেতনা বিক্রির বিষয় নয়, ধারণ করার বিষয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা, এবং বিএনপি সরকার গঠন করলে এই বিষয়গুলো মাথায় রাখা উচিত।
শিল্প-সংস্কৃতিতে মব প্রতিরোধ ও সরকারের দায়িত্ব
গত দেড় বছরে শিল্প-সংস্কৃতিতে দেখা গেছে বিভিন্ন মব ও হামলা, যা এখনো শেষ হয়নি। আজাদ আবুল কালাম বলেন, আগামী দিনে শক্তভাবে এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে। শিল্প-সংস্কৃতিতে কাজ করা মানুষরা যাতে মুক্তমনে কাজ করতে পারেন, সেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। বাউল দেখলে যন্ত্রানুষঙ্গ কেড়ে নেওয়া বা কনসার্ট পণ্ড করা—এসব মোটেও চলবে না।
তিনি বলেন, দেশে এই মব তৈরি হয়েছে, যা বেশি দিনের নয়। ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের পর অদ্ভুত উগ্রবাদের বিস্ফোরণ ঘটেছে। ছায়ানট, উদীচী, ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং এদের টার্গেট স্পষ্ট। নির্বাচনের পর এরা হাওয়া হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা উচিত নয়। যারা এগুলো করেছে, তাদের যথাযথ বিচারের আওতায় আনা সরকারের উচিত। শুরু থেকেই এসব ব্যাপারে সরকারের কঠোর হওয়া প্রয়োজন, এবং মবতন্ত্রের ব্যাপারে সাবধান থাকা জরুরি। এই সরকার মানুষের ভোটে নির্বাচিত হওয়ায়, তাদের পক্ষে এগুলো করা সহজ।
শিল্পকলা একাডেমির বাজেট ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন
শিল্পকলা একাডেমির ব্যাপারে আজাদ আবুল কালাম বলেন, শিল্প-সংস্কৃতিতে বাজেট সবচেয়ে কম। ৬৪ জেলায় শিল্প, সাহিত্য, নাচ, গানের অনুষ্ঠান করার অর্থনৈতিক সক্ষমতা শিল্পকলা একাডেমির নেই। এ ক্ষেত্রে বাজেটে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার, যাতে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া যায়।
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও একুশে পদকে স্বচ্ছতা
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, এমন পুরস্কারপ্রাপ্ত রয়েছেন যারা সবচেয়ে বেশিবার পুরস্কার পেয়েছেন এবং জুরিবোর্ডেও ছিলেন। তারা নিজের জন্য তো নিয়েছেনই, নিকটাত্মীয়ের জন্যও পুরস্কারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আজাদ আবুল কালাম সরকারের দায়িত্বশীলদের বলেছেন, এদের চিহ্নিত করা এবং যোগ্যদের কাজের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা উচিত। ও আমার লোক, ও আমার লোক না—এই ভেবে পুরস্কার ভাগাভাগি করা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
সর্বশেষ একুশে পদকের ক্ষেত্রে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে পুরস্কার ঘোষণা করেছে, সেখানেও মনে হয়েছে প্রভাবিত হয়ে করা হয়েছে। যোগ্য মানুষকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য মানুষকে একুশে পদক দেওয়া হয়েছে। এসব দিকে নজর দেওয়া খুবই জরুরি, যাতে পুরস্কার বিতরণে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত হয়।
