২০২৪ সালে চতুর্থবার পোলিশ আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে যাওয়াটা আমার জন্যে আগের বছরই নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। কীভাবে সেটা হলো সেই গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। আমার নিজেরই ভুলে সেবছর কবিতা উৎসবে পৌঁছাতে একদিন দেরি হয়ে যায়। ফলত, আমি প্রথম দিনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে কবিতা পড়া ও তাদের সাথে মতবিনিময়ের সময় অনুপস্থিত ছিলাম। আয়োজক, কবি কাজিমেয়ারেজ বুরনাত মনঃক্ষুণ্ন হলেও সেজন্যে আমাকে ভর্ৎসনা করেননি। তবে, শুরুর দিন বিকেলে যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, তা তিনি পরের দিন বিকেলে আমার উপস্থিতিতে করেন। আমার ফেরার টিকিট ছিল অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার একদিন পরে। ওদিকে কাকতালীয়ভাবে আমার কবিবন্ধু আমির অরও একইভাবে টিকিট করেছিলেন। তাই আমাদের দু’জনকেই ভ্রসলোভ শহরে অতিরিক্ত একটি রাত কাটাতে হয়।
অতিরিক্ত রাতের আয়োজন
যদিও কবিতা উৎসব শেষে কোনো কবির অতিরিক্ত সময়ের থাকা ও অন্যান্য খরচ বহন করার দায়িত্ব উৎসব কমিটি নেয় না, কিন্তু ভ্রসলোভ শহরে আমাদের দু’জনের জন্যেই অতিরিক্ত রাত অবস্থানের সব ব্যবস্থাই কমিটির পক্ষ থেকে করা হয়। আমার অনুবাদক, কবি ক্যাতারজিনা জর্জিও, আমাদের দু’জনকেই উৎসবের শহর পোলনিৎজা-স্দ্রুই থেকে নিজের গাড়িতে করে ভ্রসলোভ শহরে হোটেলে পৌঁছে দেন। তিনি নিজে এই শহরে বেড়ে উঠছেন, অতএব এর অলিগলি তাঁর চেনা। তিনি দিনের বাকি সময়টা আমাদের নানা দর্শনীয় জায়গা ঘুরিয়ে দেখান এবং সন্ধ্যায় কবি কাজিমেয়ারেজ বুরনাতের সাথে ডিনারে নিয়ে যান। বলা বাহুল্য, এই ডিনারের আয়োজনও করে উৎসব কমিটি।
ডিনারে গল্প-আড্ডা
শহরের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে আমাদের কত কত গল্প হয়। কত কত হাসি-আড্ডা! বিশেষত, কাজিমেয়ারেজ নানা বিষয়ে রসিকতা করতে ভালোবাসেন, এবং তাঁর উপস্থিতিতে যেকোনো আসরে হাসির রোল পড়ে যায়। যাহোক, একপর্যায়ে তিনি আমাদের দু’জনকেই বলেন, “আগামী বছর এই কবিতা উৎসবের বিশ বছরপূর্তি। আমি চাই তোমরা দু’জনই অনুষ্ঠানে যোগ দাও।” কবি কাজিমেয়ারেজ বুরনাত পোলিশ রাইটার্স ইউনিয়ন ভ্রসলোভ শাখার সভাপতি; এই শাখাটিকে লোয়ার সেলেশসিয়েল শাখাও বলা হয়ে থাকে। তিনি পোয়েটস উদাউট বর্ডার অর্গানাইজেশনেরও সভাপতি। আমরা তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করি এবং বিশতম আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব কীভাবে আরো ভালো করা যায় সে ব্যাপারে পরামর্শ দেই।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে এই কবি কিছুদিন ধরে ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন, এবং উৎসব আয়োজনের আগেও তাঁর একটি বড়ো ধরনের অপারেশন হয়ে যায়। তিনি শারীরিকভাবে আগের থেকে অনেক ভেঙে পড়লেও মানসিকভাবে কখনোই ভেঙে পড়েননি। কবিতা উৎসব আয়োজন, কবিদের সাথে যোগাযোগ, এন্থোলজি প্রকাশ ইত্যাদি বিষয়ে তাঁর উৎসাহ ও কাজে তিনি কখনোই ঢিল দেননি। তিনি একজন রবীন্দ্র ভক্ত মানুষ, এমনকি অপারেশনের পর হাসপাতালে বসে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা দিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাস লিখেছেন এবং আমাকে বলেছেন আমি যেন মন্তব্যে মূল বাংলা কবিতা লিখে দেই। তিনি আমাকে একবার বলেছিলেন, পোলিশ ভাষায় পঞ্চাশের উপরে রবীন্দ্রনাথের বই অনূদিত হয়েছে। যাহোক, তিনি যথাসময়ে আমাদের হাতে বিশতম কবিতা উৎসবের আমন্ত্রণ পৌঁছে দেবার প্রত্যয়ে দীর্ঘ আলিঙ্গন করে রেস্টুরেন্ট থেকে বিদায় নেন।
ভ্রসলোভের রাত
আমি, আমির ও ক্যাতারজিনা ডিনার শেষে ভ্রসলোভয়ের রাস্তা দিয়ে দক্ষিণ দিকে হাঁটতে থাকি, উদ্দেশ্য ক্যাতারজিনার গাড়ি। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “তোমরা কি এখন হোটেলে যাবে, নাকি অন্য কোনোখানে?” আমি কিছু বলার আগেই আমির উত্তর দেন, “তুমি আমাদের যেখানে নিয়ে যাবে আমরা যেতে রাজি আছি।” ক্যাতারজিনা ঘড়ি দেখে বলেন, “হাতে আড়াই ঘণ্টার মতো সময় আছে। আমি যদি এখান থেকে নয়টায় রওনা হই, তাহলে মা ঘুমিয়ে পড়ার আগেই বাড়িতে পৌঁছাতে পারবো।” তিনি বাসায় তাঁর মাকে রেখে এসেছেন, নিজের পোষা বিড়ালগুলোকে পাহারা দিতে। মা থাকেন ভ্রসলোভ শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে, তবে ক্যাতারজিনার নিজের বাড়ি সেখান থেকে ষাট/সত্তর কিলোমিটার দূরে পটাসনিয়া নামের একটি গ্রামে।
তিনি আমাদের স্থানীয় একটি বার-এ নিয়ে যান। বলেন যে ওই বারে তিনি এমনকি একসময় গানও গেয়েছেন। আমি বলি, “সে জন্যেই তুমি এত ভালো পিয়ানো বাজাও!” “উঠতি বয়সে কত কিছুই না করেছি! গানের গলা আমার খারাপ ছিল না।” ক্যাতারজিনা বেশ গর্বের সাথে বলেন। আর আমি এই কবিকে যতই দেখি, তার সম্পর্কে যতই জানি ততই মুগ্ধ হই। তাঁর কথা বলা, চলা ফেরা, মানুষকে সহজে আপন করে নেয়া, তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা অনুবাদ করে ফেলা—একের ভেতরে অনেক বলতে যা বোঝায় তিনি তাই।
প্রথম পরিচয়
তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় ২০১৯ সালে কবি কাজিমেয়ারেজ আয়োজিত এই কবিতা উৎসবেই। ওই বছর মে মাসে গ্রিসে কবি মারিয়া মিস্ট্রিয়টির আমন্ত্রণে গিয়ে একঝাঁক পোলিশ কবি ও শিল্পীর সাথে পরিচয় এবং অন্তরঙ্গতা হয়। না, সেখানে ক্যাতারজিনা ছিলেন না। ছিলেন কাজিমেয়ারেজ বুরনাত, দানুতা বারতোস, এরেস চাদনিকোলাও, ইয়াসেক ভিসোয়োস্কি ও ডারিউস টমাস লেবিয়ডা। অবশ্য সেখানেই প্রথম আমির অর-এর সাথে পরিচয় ও বন্ধুত্ব হয়। ডারিউস লেবিয়ডাই আমার জন্যে মারিয়া মিস্ট্রিয়টিকে সুপারিশ করেছিলেন। ইসরাইলি কবি আমির অর ও ইরাকি কবি হাতিফ জানাবির সাথেও তিনি আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। ডারিউস, আমির ও হাতিফ হলেন গলায় গলায় বন্ধু, আমিও অল্প সময়ে তাঁদের বন্ধু হয়ে যাই।
যাহোক, গ্রিক কবিতা উৎসব চলা কালে আমি দুটি পোলিশ কবিতা উৎসবে দাওয়াত পাই। প্রথমে ইয়াসেকের সাথে দ্বিভাষিক কথোপকথনে আমাকে আমন্ত্রণ করেন কবি কাজিমেয়ারেজ বুরনাত। আমি তাঁর আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। কিন্তু পরদিনই কবি দানুতা বারতোস তাঁর আয়োজিত কবিতা উৎসবে পোজন্যানে যাবার আমন্ত্রণ জানান। আমি তাঁকেও নিরাশ না করে বলি যে যেহেতু আমি শিক্ষকতা করি, একই বছর আমার এতগুলো ছুটি পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে, আমি তাঁর অনুষ্ঠানে পরের বছর যাওয়ার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। তিনি রাজি হন এবং বলেন যে যথাসময়ে আমাকে আমন্ত্রণ পাঠাবেন।
দানুতা বারতোস বেশ কিছুদিন আমেরিকায় বসবাস করেছেন, ফলে তিনি কাজ চালিয়ে যাবার মতো ইংরেজি বললেও কাজিমেয়ারেজ বুরনাত এক অক্ষর ইংরেজি বলেন না। ফলে বুরনাতের সাথে কথাবার্তা বলতে হলে দোভাষির দরকার হয়। গ্রিসে সেই কাজটি করেন ইয়াসেক ও কাসা। কাসা ছিলেন একজন পোলিশ প্রফেসর ও অনুবাদক, দুঃখজনকভাবে যার সাথে আমার আর কখনো দেখা হয়নি।
বয়স নিয়ে মজার ঘটনা
গ্রিসে একটি মজার ঘটনা ঘটে। একদিন কিছুটা বাড়তি সময় হাতে থাকায় আমি, দানুতা, কাজিমেয়ারেজ ও কাসা খালকিদা শহরে শপিংয়ে বের হই। কাসা তাঁর বাচ্চার জন্যে কাপড়চোপড় কেনেন, দানুতা ও কাজিমেয়ারেজও তাঁদের ছোটো ছোটো নাতিনাতনির জন্যে কিছু না কিছু কেনেন। আমাকে কিছু না কিনতে দেখে দানুতা জিজ্ঞেস করেন যে আমি আমার ছোটো বাচ্চাদের জন্যে কিছু কিনব কিনা। আমি মজা করে বলি, “ছোটো নয়, বড়ো বাচ্চার জন্যে কিনব।” দানুতা বলেন, “তার মানে কী? তোমার বাচ্চার বয়স কত?” আমি বলি, “আমার একটি মাত্র ছেলে, যার বয়স উনিশ বছর!” কাসার থেকে অনুবাদে উত্তরটি শুনে কাজিমেয়ারেজ বুরনাত একেবারে আমার সামনে এসে দাঁড়ান। বলেন, “কি বলছো তোমার উনিশ বছরের সন্তান আছে?” আমি বলি, “হ্যাঁ, সমস্যা কোথায়?” দানুতা বলেন, “তাহলে তোমার বয়স কত?” এবার কাজিমেয়ারেজ ফোঁড়ন কাটেন, “তেত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ!” আমি বলি দানুতা, “তোমার কি ধারণা?” তিনি আমতা আমতা করে বলেন, “বড়ো জোর চল্লিশ!” আমি হো হো করে হেসে উঠি। বলি, “তোমাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আমি দুই বছর আগে পঞ্চাশ পেরিয়েছি!” এবার কাজিমেয়ারেজ বুরনাতও হাসেন, “তুমি যদি পঞ্চাশ পেরিয়ে থাকো, আমি নব্বই পেরিয়ে গেছি!” তাঁর চোখেমুখে দুষ্টুমির আভা ফুটে ওঠে। আমি বলি, “বেশতো! আজ থেকে তুমি আমার গ্র্যান্ডপা!” সেই থেকে বেশকিছু দিন আমি তাঁকে গ্র্যান্ডপা বলে ডেকেছি।
অনেকের মুখেই শুনেছি যে আমার বয়স ধরা যায় না। আমি চল্লিশের নিচে বলেই তারা ধারণা করেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর একটি কুফল আমি লক্ষ্য করেছি। কয়েক বছর আগে মরক্কো কবিতা উৎসবের শেষ দিকে নিউজিল্যান্ডের কবি স্যু জু বলেন, “তোমার মতো ভদ্র ও বিনয়ী কবি আমি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খুব কম দেখেছি।” আমি বলি, “বলো কী? বাঙালি কবিরা শুনলে তোমাকে পাগল ডাকবে!” তিনি সরাসরি আমাকে ভাই বলে সম্বোধন করেন, “আমার তো কোনো ভাই নেই, আজ থেকে তুমি আমার বড়ো ভাই।” আমি, “কৃতজ্ঞতা জানাই।” তিনি বলেন, “কিন্তু একটা সমস্যা আছে, তোমার বয়স খুব কম মনে হয়। ফলত, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তুমি প্রাপ্য সম্মানটি পাও না।” আমি বলি, “আমি যখন বুঝি যিনি বা যারা এই কাজটি করেন এবং পরে জেনে বুঝে শেষ পর্যন্ত সেই সম্মান ফিরিয়ে দেন, তখন আমি পুলকিত হই। বেশ মজা পাই।”
দানুতা বারতোস দেশে ফিরে ফেসবুকে আমাকে নিয়ে একটি স্ট্যাটাস লেখেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে আমাকে তিনি দাওয়াত করেও সেই বছর তাদের অনুষ্ঠানে নিতে পারছেন না, কিন্তু পরের বছর আমি সেখানে যাবো বলে অঙ্গীকার করেছি। তিনি বেশ কিছু প্রশংসার বাণীও রাখেন যা আমাকে আনন্দ দেয়।
কবিতা উৎসব ও অনুবাদ
নভেম্বরে আমি কাজিমেয়ারেজ বুরনাতের কবিতা উৎসবে ভ্রসলোভ হয়ে পোলানিৎজা-স্দ্রুই শহরে যাই। প্রতি উৎসবেই বেশ বড়ো করে একটি এন্থোলজি প্রকাশ করা হয়। সেই উৎসবের এন্থোলজিতে আমার চারটি কবিতা পোলিশ ভাষায় প্রকাশিত হয়, যার অনুবাদক ছিলেন আরেক পোলিশ কবি টোমাস মারেক সবুরেজ। তিনি ২০১৬ সালে ফেসবুকে আমার সাথে যোগাযোগ করে চারটি কবিতা অনুবাদ করেন, এবং তার সম্পাদিত ‘ক্রিটিকা লিটারিকা’ নামক পত্রিকায় প্রকাশ করেন। সেই কবিতাগুলোই ২০১৯ সালে কাজিমেয়ারেজ বুরনাতের এন্থোলজিতে পুনর্মুদ্রণ হয়।
ওই উৎসবে আমি দ্বিভাষিক কবি হিসেবে ক্যাতারজিনা জর্জিওকে পাই। তিনি ইংরেজিতে উৎসবের বিভিন্ন পর্যায়ে আমার বক্তৃতা অনুবাদ করে দিতে থাকেন, এবং এন্থোলজি থেকে পোলিশ ভাষায় আমার কবিতাগুলো পড়ে শোনান। ইতোমধ্যে জানতে পারি যে তিনি কিছু দিন কানাডায় বসবাস করেছেন, এবং যেহেতু আমি আমেরিকায় বসবাস করি, সেই ভৌগোলিক সূত্রটা আমাদের বন্ধুত্বের প্রথম থেকে বেশ কাজে আসে, মানে তিনি ইতোমধ্যে আমার ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন। এতটাই বন্ধু হন যে একদিন বাসে করে আমরা কোথাও যাবার সময় আমার সুগার কমে যায়। তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের ব্যাগের থেকে একটি ক্যান্ডি বের করে আমাকে দেন। আমি সেটি খেয়ে নিজের অবস্থা সামলিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করি, “তুমি কি করে জানলে যে পথিমধ্যে আমার সুগার কমে যেতে পারে।” তিনি বলেন, “আমি আগের দিনই লক্ষ্য করেছি যে লাঞ্চ দেরিতে খেলে তোমার সমস্যা হয়।”
ওদিকে আমি একই কবিতা বারবার পড়তে পড়তে বিব্রত বোধ করতে থাকি এবং উৎসবের তৃতীয় দিন কাথারজিনাকে বলি, “শোনো আমি অন্য একটি কবিতা পড়বো আজ, তুমি কি তাৎক্ষণিকভাবে অডিয়েন্সের জন্যে অনুবাদ করে দিতে পারবে!” তিনি বলেন, “দেখি কবিতাটি।” আমি তাকে ‘স্বতন্ত্র সনেট ৭৭’ কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ পড়তে দেই। পরে মঞ্চে দাঁড়িয়ে আমি একলাইন ইংরেজিতে পড়ে তাকে সময় দেই। তিনি সেই লাইনটি পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করে শোনান। এইভাবে কবিতা পড়া শেষ হতে না হতেই তাঁর কাছে ছুটে আসেন একজন সম্পাদক। বলেন, “কবিতাটি দাও, পত্রিকায় ছাপবো।” ক্যাতারজিনা বলেন, “আমি তো অনুবাদ করিনি?” সম্পাদক বলেন, “তুমি চমৎকার অনুবাদে কবিতাটি পড়ে শোনালে!” তিনি তখন তাৎক্ষণিক সেই অনুবাদের গল্প খুলে বলেন। সম্পাদক বলেন, “আমাকে তাড়াতাড়ি ওটা লিখে দাও।” তাই হয়। এবং সেটাই আমার প্রথম কবিতা যা ক্যাতারজিনা পোলিশ ভাষায় অনুবাদ করেন।
পরদিন ক্যাতারজিনাকে নিয়ে স্থানীয় শপিংমল যাই কিছু সুভেনির কিনতে। সেখানে এক তরুণ কবি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, “পোলিশ ভাষায় তোমার বই কবে পাবো?” আমি বলি, “অনুবাদক তো আমার সাথেই আছেন। তিনিই বলতে পারবেন।” সেই থেকে ক্যাতারজিনার সাথে আমার বন্ধুত্ব। তিনি ২০২২ সালে আমার কবিতার বই ‘আন্ডার দ্যা থিন লেয়ার্স অব লাইট’ তাঁর অনুবাদে পোলিশ ভাষায় প্রকাশ করেন। সেই বইয়ে দু’টি নতুন কবিতা স্থান পায়, ‘স্বতন্ত্র সনেট ৭৭’ এবং ‘ছোটো হওয়ার গল্প’। প্রথম কবিতাটি স্থান পাওয়ার গল্প ইতোমধ্যে বলেছি। তবে, দ্বিতীয় কবিতাটি কীভাবে বা আদৌ ওই বইয়ে আছে সেটি আমি আবিষ্কার করি ২০২৪-এর উৎসবের পরে, ক্যাতারজিনার বাড়িতে বসে। তিনি বলেছিলেন, “কখন যে অনুবাদ করেছিলাম আমারও মনে নেই। কিন্তু আমার ভালো লেগেছিল কবিতাটি পড়ে। তাই ভাবলাম বইয়ে রেখে দেই।”
২০২৪ সালে ধারাবাহিক ঘটনাবলিতে আরেকটু পরে আসি, তার আগে ওই সন্ধ্যায় ভ্রসলোভ বার-এর গল্পটা শেষ হোক। ওখানে গিয়ে দেখা গেলো বার টেন্ডারসহ সবাই ক্যাতারজিনার পরিচিত। তিনি আমাকে ও আমিরকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। কবি বলেই আমরা একটু বেশি খাতির পেলাম। তাছাড়া ক্যাতারজিনার বন্ধু বলে কথা। আমরা তিনজনে তিন রকম পানীয় নিলাম। আমার পানীয় বেশ বড়োসড়ো গ্লাসে এলো, তাই নিয়ে ক্যাতারজিনা ও আমির কিছুক্ষণ হাসলেন এবং গ্লাসসহ আমার ছবি তুললেন। ক্যাতারজিনার গ্লাসে বরফ ও পানীয় দারুণ একটি কৌশলে ঢাললেন বার-টেন্ডার। আমি সেটির ভিডিও করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে এলেন সার্বিয়ান কবি মিলিটুন জুরিকোভিক স্থানীয় দু’জন বন্ধুকে সাথে নিয়ে। তিনিও কবিতা উৎসবে আমন্ত্রিত ছিলেন, এবং বুঝতে পারলাম রাতে ভ্রসলোভ শহরে বন্ধুর বাসায় বিশ্রাম নিয়ে পরদিন তিনি প্লেনে চড়বেন। ক্যাতারজিনার মেসেজ পেয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন। ওদিকে আমাদের ফ্লাইটও সকাল সাতটায়, তার মানে চারটের সময় ঘুম থেকে উঠতে হবে। হোটেলে আমরা আগেই বলে রেখেছি ওয়েকআপ কলের কথা।
সন্ধ্যাটা বেশ মজা করে কাটালাম। ক্যাতারজিনা পিয়ানো বাজিয়ে একটা গানও শোনালেন। এরপর আমরা সেখান থেকে হেঁটে হেঁটে হোটেলে ফিরলাম। আমাদের হোটেল লবিতে রেখে ক্যাতারজিনা বিদায় নিলেন। আমরা দীর্ঘ আলিঙ্গনে আমাদের এই কবিবন্ধুটিকে বিদায় জানালাম। তিনি বললেন, “খুব তাড়াতাড়ি আমাদের আবার দেখা হচ্ছে।”



