শৈশব ও শিক্ষাজীবন
জিয়াউল ফারুক অপূর্বর জন্ম ২৭ জুন, ঢাকায়। তাঁর বাবা একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা ছিলেন শিক্ষক। বাবার চাকরির কারণে শৈশবের একটি বড় সময় দেশের বিভিন্ন জেলায় কাটে। ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি আগ্রহ ছিল। স্কুলজীবনে আবৃত্তি, গান ও মঞ্চে অংশ নিলেও অভিনয়কে কখনো পেশা হিসেবে ভাবেননি। পরিবারের ইচ্ছাও ছিল, তিনি প্রকৌশলী হবেন। সে লক্ষ্যেই পড়াশোনা এগিয়ে নেন। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন তিনি।
অভিনয় জগতে আগমন
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে বন্ধুদের উৎসাহে মডেলিং দিয়ে মিডিয়ায় অপূর্বর যাত্রা শুরু। একটি মুঠোফোন কোম্পানির বিজ্ঞাপনে কাজ করে দর্শকের নজরে আসেন। এরপর নাটকের প্রস্তাব আসতে থাকে। অভিনয়ে তাঁর স্বাভাবিকতা, সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দায় সহজ উপস্থিতি খুব দ্রুত দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। অল্প সময়ের মধ্যেই ছোট পর্দার ব্যস্ত অভিনেতাদের একজন হয়ে ওঠেন তিনি।
জনপ্রিয়তা ও ক্যারিয়ারের মোড়
প্রথম দিকে ‘রমিজের আয়না’ দিয়েই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন অপূর্ব। পরে ‘এক্সফ্যাক্টর’, ‘বড় ছেলে’ দিয়ে তুমুল আলোচিত হন। তিনি এমনটাও বলেছেন, ‘বড় ছেলে’ নাটকটি তাঁকে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছে। সেই থেকে তিনি এখনো তুমুল আলোচিত।
২০১০ সালের পরের সময়ে বহু তরুণ–তরুণী এই অভিনেতার পোস্টার কিনে ঘরে ঝুলিয়ে রাখতেন, পত্রিকার পাতা থেকে ছবি কেটে টাঙিয়ে রাখতেন। এ নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে অপূর্ব বলেছিলেন, ‘ভক্ত মানেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আমার যদি একটা ভক্তও থাকে, আমি অনেক বেশি সৌভাগ্যবান। আল্লাহ আমাকে অনেক ভাগ্য নিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যার কারণেই বিনা স্বার্থে সবাই আমাকে ভালোবাসেন। যে কারণেই হয়তো ছবি কেটে বা ছবি কিনে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখেন। এটা ভালোবাসা।’
চরিত্রের বৈচিত্র্য
অপূর্বর বেশির ভাগ নাটকই রোমান্টিক ঘরানার। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি রোমান্টিক চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান। একের পর এক নাটক দর্শকপ্রিয় হওয়ায় তাঁকে ‘রোমান্টিক নায়ক’ হিসেবেই বেশি কাস্ট করা হয়। তবে সময়ের সঙ্গে নিজেকে বদলানোর চেষ্টা করেছেন। পারিবারিক গল্প, সামাজিক নাটক, থ্রিলার ও ওয়েব কনটেন্ট—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয়ের পরিসর বাড়িয়েছেন।
ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ ও মানসিক সংকট
অপূর্বর ক্যারিয়ারে উত্থানের পাশাপাশি কিছু কঠিন সময়ও এসেছে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকলেও ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা বারবার আলোচনায় এসেছে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভাঙন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সমালোচনা কিংবা কাজের চাপ—সবকিছুই তাঁকে মানসিকভাবে নাড়া দিয়েছে। তবে প্রতিবারই তিনি কাজে ফিরে এসেছেন। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘ব্যক্তিগত সংকটকে কখনোই কাজের ওপর প্রভাব ফেলতে দিতে চান না।’
বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা
অভিনয়শিল্পীর জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে বাবা হওয়ার পর। আর ছেলের জন্ম হয় ২০১৪ সালের আজকের দিনে। ছেলের নাম জাইয়ান ফারুক আয়াশ। জীবনের অনেক জন্মদিন উদ্যাপন করলেও জীবনের সেরা জন্মদিন ছিল ছেলের জন্মদিন। ওই দিনটা আগের মতো এখনো জীবনের সেরা হয়ে থাকে। এখনো বেশির ভাগ সময় বাবা–ছেলে একসঙ্গে কাটান।
ছেলে জন্মের পর একাধিক সাক্ষাৎকারে অপূর্ব বলেছেন, ‘সন্তান আমার জীবনকে নতুনভাবে দেখতে শিখিয়েছে। আগে নিজের, কাছের মানুষদের জন্য বাঁচলেও পরে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ছেলের কথা ভাবতে শুরু করি।’ তিনি একবার এমনটাও বলেছিলেন, ‘বাবা হওয়ার পর বুঝেছি দায়িত্ব কী। জীবনটাকে তখন নতুন করে সাজাতে হয়েছে।’ তাঁর ভাষায়, সেটিই ছিল জীবনের ‘দ্বিতীয় জন্ম’। পরে তিনি গত বছর ডিসেম্বরে কন্যা সন্তানের পিতা হন।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
অপূর্ব মনে করেন, জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু একজন শিল্পীর আসল পরিচয় তাঁর কাজ। তাই দর্শকের ভালোবাসা ধরে রাখতে তিনি নিয়মিত নিজেকে নতুনভাবে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেন। নাটকের পাশাপাশি ওটিটি প্ল্যাটফর্মের কাজেও তিনি এখন নিয়মিত। নতুন মাধ্যমের গল্প ও চরিত্র তাঁকে অভিনয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে বলেও জানিয়েছেন। সম্প্রতি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পাওয়া ‘হেডলাইন’ ওয়েব সিরিজ নিয়েও প্রশংসিত হচ্ছেন।
দীর্ঘ পথচলার প্রতিচ্ছবি
দুই দশকের বেশি সময় ধরে টেলিভিশন নাটকে ধারাবাহিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখা খুব কম অভিনয়শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। অপূর্ব সেই ব্যতিক্রমদের একজন। সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি বদলেছে, নাটক দেখার মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তায় বড় কোনো ভাটা পড়েনি। বরং টেলিভিশন থেকে ইউটিউব, সেখান থেকে ওটিটি—প্রতিটি মাধ্যমে তিনি নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তাঁর নাটকের ভিউ এখনো অনেকের চেয়ে বেশি। এগিয়ে থাকে ভিউয়ে।
অপূর্ব জনপ্রিয় অভিনেতার গল্প নয়; বরং স্বপ্ন বদলে যাওয়া, বারবার নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলা এবং ব্যক্তিগত সংকট পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ যাত্রার গল্প। যে কারণেই হয়তো তিনি সফলতা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি জীবনটাকে সহজ করে চিন্তা করি, টেনশন মাথায় নিয়ে কখনোই কোনো কিছু চিন্তা করি না। নিজের মতো কোনো সবকিছু ভাবতেই ভালো লাগে।’



