তিন দশক আগে এক পরিচালকের মন্তব্যে মন খারাপ হয়েছিল সাইফ আলী খানের। পরিচালক তাঁকে বলেছিলেন, বিশ্বাসযোগ্য পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে তাঁকে মানাবে না! কারণ, তাঁর মধ্যে নাকি সেই গাম্ভীর্য নেই। অথচ সময়ই সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া ‘কর্তব্য’ ছবিতে জটিল এক পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা কুড়িয়েছেন সাইফ।
পুরোনো ঘটনার স্মৃতিচারণ
‘কর্তব্য’র ট্রেলার প্রকাশ অনুষ্ঠানে কয়েকটি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন সাইফ। সেখানে পুরোনো সেই ঘটনার কথা মনে করে সাইফ বলেন, ‘প্রথমবার পুলিশের পোশাক পরেছিলাম “ম্যায় খিলাড়ি তু আনাড়ি” ছবির ক্লাইম্যাক্সে। তখন পরিচালক বলেছিলেন, “জীবনে কখনো সিরিয়াস পুলিশ অফিসারের চরিত্রে অভিনয় কোরো না। পুলিশের পোশাকে তোমাকে হাস্যকর লাগে।” আজ এখানে পৌঁছাতে পেরে তাই আমারই অবাক লাগে। কাজ করে যেতে থাকলে, শিখতে থাকলে একসময় অনেক কিছুই সম্ভব হয়।’
‘সেক্রেড গেমস’ ও পুলিশ চরিত্রে আত্মবিশ্বাস
সাইফ জানান, ‘সেক্রেড গেমস’ তাঁর অভিনয়জীবনের বড় এক বাঁক। ওই সিরিজে পুলিশ কর্মকর্তা সরতাজ সিংয়ের চরিত্রে অভিনয় করে তিনি নতুনভাবে আত্মবিশ্বাস পান। তাঁর মতে, পুলিশ চরিত্রের আসল শক্তি ইউনিফর্মে নয়, মানুষটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলায়। ‘তুমি একজন মানুষকে অভিনয় করছ, শুধু একজন পুলিশকে নয়। তবে উর্দি পরলে দায়িত্ব আর ক্ষমতার একটা অনুভূতি আসে। সেটা ধারণ করতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ,’ বললেন নবাবপুত্র।
‘কর্তব্য’ সিনেমার নতুন অভিজ্ঞতা
‘কর্তব্য’ নিয়ে সাইফের উচ্ছ্বাসের আরেকটি কারণ, এই ছবি তাঁকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের চরিত্র করতে পারাটাই সবচেয়ে আনন্দের। পরিচালক যদি বিশ্বাস করেন, আমি একেবারে মাটির কাছাকাছি মানুষের চরিত্রও করতে পারি, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। একটা সময় আমরা শুধু এনআরআই প্রেমের গল্প বলতাম। এখন নিজেদের গল্প বলছি।’
ইমেজ ভাঙার চ্যালেঞ্জ
নিজের ইমেজ নিয়েও খোলামেলা কথা বলেন সাইফ। তাঁর মতে, মানুষ তাঁকে সব সময় শহুরে, ইংরেজিতে সাবলীল একজন মানুষ হিসেবেই দেখেছে। তাই ‘ওমকারা’ ছবির ল্যাংড়া ত্যাগীর চরিত্রে তাঁকে নেওয়া অনেকের কাছেই বিস্ময়ের ছিল। ওমকারা অভিনেতা বললেন, ‘আজও বুঝতে পারি না, দিল চাহতা হ্যায়–এর পর বিশাল ভরদ্বাজ কেন আমাকে ওই চরিত্রে ভেবেছিলেন। তবে সেই সিদ্ধান্তই আমার অভিনয়জীবন বদলে দিয়েছে। ওই ছবির পর মানুষ আমাকে অভিনেতা হিসেবে নতুনভাবে দেখতে শুরু করে।’
গণ্ডি ভাঙার গুরুত্ব
সাইফ মনে করেন, ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনয়শিল্পীদের খুব দ্রুত একটা ছকে ফেলে দেওয়া হয়। ‘কে কী ধরনের চরিত্র করতে পারবে, সেটা ধরে নেওয়া হয়। সেই গণ্ডি ভাঙতে পারাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।’ ‘কর্তব্য’–এ তাঁর হরিয়ানভি উচ্চারণও দর্শকের নজর কেড়েছে। সাইফ বলেন, ‘এটা শুধু সংলাপ মুখস্থ করার বিষয় নয়; ভাষার সঙ্গে সংস্কৃতি, ছন্দ আর আবেগও শিখতে হয়। অনেক দিন শুনেছি, অনুশীলন করেছি। এখন মনে হয়, বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই টানে কথা বলতে পারি।’
পবন সিং চরিত্রের জটিলতা
ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র পবন সিং সম্পর্কে সাইফ বলেন, ‘পবন সব সময় নিজের সঙ্গেই লড়াই করে। কোনটা ঠিক, কাকে রক্ষা করবে, কী সিদ্ধান্ত নেবে—এসব প্রশ্ন তাকে তাড়া করে। “কর্তব্য”র সবচেয়ে ভালো দিক হলো, এখানে সহজ কোনো উত্তর নেই। প্রতিটি সিদ্ধান্তেরই একটা মূল্য আছে।’
বাস্তব জীবনে দায়িত্ববোধ
বাস্তব জীবনেও দায়িত্ববোধকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন সাইফ। তিনি বলেন, ‘পরিবারের দায়িত্ব সব সময়ই থাকে। সন্তানদের স্কুল, তাদের সময় দেওয়া—এসব গুরুত্বপূর্ণ। কখনো মনে হয়, আমি আমার মাকে হতাশ করছি না তো? এসব বিষয় সব সময় মাথায় রাখি।’ কথায় কথায় ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণা করেন, ‘কলকাতায় বাবাকে নিয়ে একটি ক্রিকেট অনুষ্ঠান ছিল। মা যেতে পারেননি। তখন মনে হয়েছিল, সেখানে যাওয়া আমার দায়িত্ব।’
শিল্পীর দায়িত্ব ও শিশু নিরাপত্তা
একজন শিল্পীর দায়িত্ব কী—এমন প্রশ্নের উত্তরে সাইফ বলেন, ‘চরিত্রকে যতটা সম্ভব সততার সঙ্গে তুলে ধরাই একজন শিল্পীর কাজ। শুধু সুন্দর দিক দেখালেই হবে না, বাস্তবতাও দেখাতে হবে।’ শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আজ সারা পৃথিবীই চিন্তিত। আমরা সবাই চেষ্টা করছি; কিন্তু এর সহজ কোনো উত্তর নেই।’



