শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ
২৯ জুন ২০২৬। বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে আরেকটি বেদনাময় দিন। এই দিনে আমরা হারালাম দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পী, পাপেটশিল্পের পথিকৃৎ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাতা এবং অসামান্য সাংস্কৃতিক সংগঠক মুস্তাফা মনোয়ারকে। তাঁর বিদায়ে শুধু একজন শিল্পীর জীবনাবসান হয়নি; যেন আমাদের শৈশব, আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতি আর সৃজনশীলতার একটি উজ্জ্বল অধ্যায়েরও পরিসমাপ্তি ঘটল।
পাপেটবন্ধু: শিশুদের মনের ভাষা
তিনি পুতুল দিয়ে শুধু গল্প বলেননি; তিনি মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের মনের ভাষা বুঝতেন। সেই ভাষাতেই কথা বলতেন। আজকের পৃথিবীতে আমরা ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন নিয়ে কাজ করি। আমরা জানি, সফল যোগাযোগের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো টার্গেট অডিয়েন্সকে বোঝা। মানুষ কী ভাবে, কী অনুভব করে, কী শুনতে চায়—তা না বুঝে কোনো যোগাযোগই সফল হয় না। মুস্তাফা মনোয়ার এই কাজটাই করেছিলেন বহু আগেই, যখন ‘টার্গেট অডিয়েন্স’, ‘ইউজার ইনসাইট’ কিংবা ‘হিউম্যান-সেন্টারড ডিজাইন’—এসব শব্দ আমাদের অভিধানে ছিল না। তিনি শিশুদের জন্য অনুষ্ঠান বানাননি; শিশুদের মন বুঝে অনুষ্ঠান বানিয়েছিলেন। আর সে কারণেই তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি হয়ে উঠেছিল সময়ের সীমা অতিক্রম করা এক অনন্য শিল্পকর্ম।
‘মনের কথা’: শৈশবের স্মৃতি
আমাদের শৈশবে ছিল না ইউটিউব, ছিল না ফেসবুক, ছিল না অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেলের ভিড়। ছিল কেবল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। বিকেল হলেই পরিবারের সবাই মিলে টেলিভিশনের সামনে বসে অপেক্ষা করতাম। তারপর পর্দায় ভেসে উঠত সেই প্রিয় অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’। আজ মনে হয়, নামটি শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না; যেন সত্যিই সেটি ছিল আমাদেরই মনের কথা। পারুল, বাউল ভাই, মেনি, বাঘা, রাখাল কিংবা দাদু—এই চরিত্রগুলো ছিল আমাদের পরিবারেরই সদস্য। তারা কখনো নীতিকথা চাপিয়ে দিত না; বরং গল্প, হাসি আর ভালোবাসার মধ্য দিয়ে শিখিয়ে দিত মানবিকতা, সহমর্মিতা, প্রকৃতিপ্রেম, সৃজনশীলতা ও দেশপ্রেম। সেই সময়ের শিশুদের আবেগ, কৌতূহল আর কল্পনার জগৎকে এত গভীরভাবে খুব কম মানুষই বুঝতে পেরেছিলেন।
পারুল থেকে মীনা: পাপেটশিল্পের বিকাশ
বাংলাদেশের পাপেটশিল্পকে আধুনিক রূপ দেওয়ার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের। হুগলি, বাঁকুড়া ও কলকাতায় পাপেট দেখে তাঁর আগ্রহ জন্মেছিল। পরে তিনি বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্যকে আধুনিক শিল্পভাবনার সঙ্গে মিলিয়ে সৃষ্টি করেন ‘পারুল’ চরিত্র। এই পারুলই পরবর্তী সময়ে ইউনিসেফের কর্মকর্তা র্যাচেল কার্নেগিকে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণার ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় দক্ষিণ এশিয়ার কোটি কোটি শিশুর প্রিয় চরিত্র ‘মীনা’। এক অর্থে, মীনার শিকড়ও লুকিয়ে আছে মুস্তাফা মনোয়ারের সৃজনশীল ভাবনায়।
মুক্তিযুদ্ধে শিল্পীর ভূমিকা
১৯৭১ সালে যখন দেশ জ্বলছে, লাখো মানুষ শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নিয়েছে, তখনো তিনি থেমে থাকেননি। ভারতের শরণার্থীশিবিরে পাপেট শো করে যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশু ও মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিলেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও তিনি বিশ্বাস করতেন—সংস্কৃতি মানুষের মনোবল জাগিয়ে তুলতে পারে। এটাই ছিল তাঁর শিল্পচর্চার সবচেয়ে মানবিক রূপ।
প্রতিবাদী শিল্পী ও ভাষা আন্দোলন
মুস্তাফা মনোয়ার শুধু শিল্পী ছিলেন না, ছিলেন একজন সচেতন নাগরিকও। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় স্কুলে পড়াকালেই ভাষা আন্দোলন নিয়ে কার্টুন আঁকার কারণে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। পরে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দিয়ে তিনি টেলিভিশনকে বাংলা সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়ার শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলেন।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের সৃজনশীল স্থপতি
বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসে তাঁর অবদান অনন্য। ‘নতুন কুঁড়ি’, ‘মনের কথা’, ‘আজব দেশে’, ‘রক্তকরবী’, ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’—প্রতিটি নির্মাণেই ছিল তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর। শিশুদের অনুষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রীয় আয়োজন, নাটক থেকে পাপেট, মঞ্চ থেকে টেলিভিশন—সব জায়গাতেই তিনি নতুন ভাষা তৈরি করেছেন। তিনি শুধু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেননি; দর্শকের রুচি গড়ে তুলেছেন।
শিল্পের বহুমাত্রিক নক্ষত্র
চিত্রশিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল আন্তর্জাতিক। জলরং, তেলরং ও গ্রাফিকস সব ক্ষেত্রেই তাঁর কাজ প্রশংসিত হয়েছে। কিংবদন্তি নির্মাতা সত্যজিৎ রায় তাঁর জলরঙের কাজ দেখে মন্তব্য করেছিলেন—‘অল্প কয়েকটি রেখায় অনেক কথা বলা যায়।’ সত্যিই, মুস্তাফা মনোয়ারের শিল্পে ছিল সেই সংযম, যে সংযম গভীরতম অনুভূতিকেও নীরবে প্রকাশ করতে পারে।
প্রশাসক, শিক্ষক, সংস্কৃতি সংগঠক
তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। দ্বিতীয় সাফ গেমসের বিখ্যাত মাসকট ‘মিশুক’ এবং ষষ্ঠ সাফ গেমসের জীবন্ত পাপেট ‘অদম্য’ দুটিই তাঁর সৃজনশীল পরিকল্পনার ফসল। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক আয়োজন, টেলিভিশন নাটক, শিশুদের অনুষ্ঠান সব ক্ষেত্রেই তিনি রেখে গেছেন স্থায়ী স্বাক্ষর। ২০০৪ সালে শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন একুশে পদক।
প্রাসঙ্গিকতা ও উত্তরাধিকার
আজ আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল মিডিয়া, অ্যালগরিদম আর ডেটাচালিত যোগাযোগের যুগে বাস করছি। তবু একটি বিষয় অপরিবর্তিত—মানুষকে বুঝতে না পারলে কোনো যোগাযোগই সফল হয় না। মুস্তাফা মনোয়ার প্রযুক্তি দিয়ে নয়, মানুষকে বুঝে যোগাযোগ করতেন। তিনি জানতেন একটি শিশুর হাসির মূল্য কী, একটি গল্প কীভাবে শিক্ষা হয়ে ওঠে, আর একটি পাপেট কীভাবে হাজার মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে। এ কারণেই তাঁর সৃষ্টি সময়কে অতিক্রম করেছে।
বিদায়, পাপেটবন্ধু
মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের সৃষ্টি থেকে যায়। আজ হয়তো মুস্তাফা মনোয়ার আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু পারুল, বাউল ভাই, মেনি, বাঘা, রাখাল, দাদু—তাঁদের সঙ্গে আমাদের শৈশবের সেই বিকেলগুলো আজও বেঁচে আছে। আমরা যারা একসময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের সামনে বসে ‘মনের কথা’ দেখতাম, তারা জানি—সেটি শুধু একটি অনুষ্ঠান ছিল না; সেটি ছিল আমাদের বেড়ে ওঠার অংশ, আমাদের মূল্যবোধের অংশ, আমাদের শৈশবের সবচেয়ে নির্মল স্মৃতিগুলোর একটি। পাপেটবন্ধু মুস্তাফা মনোয়ার বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন এমন এক সৃজনশীল উত্তরাধিকার, যা বাংলাদেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও শিশু-কিশোরদের কল্পনার জগতে চিরকাল আলো ছড়াবে। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং গভীর কৃতজ্ঞতায় বিদায়, প্রিয় পাপেটবন্ধু।



