মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ আজ তাঁর ১০১তম জন্মদিন পালন করছেন। গত বছর তিনি শতবর্ষ অতিক্রম করেছিলেন। এই বিশেষ দিনে তাঁর জীবন, রাজনীতি, দর্শন ও উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করা হলো।
চিকিৎসক থেকে রাজনীতিক
মাহাথির বিন মোহাম্মদ ১৯২৫ সালের ১০ জুলাই মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের আলোর সেটারে জন্মগ্রহণ করেন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি সবচেয়ে ছোট। বাবা স্কুলশিক্ষক ছিলেন। ছাত্রজীবনে তিনি মেধাবী ছিলেন এবং চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। ১৯৫৩ সালে ডিগ্রি অর্জনের পর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। ১৯৫৭ সালে চাকরি ছেড়ে নিজ এলাকায় ব্যক্তিগত ক্লিনিক স্থাপন করেন, যেখানে তিনি ‘ডা. এম’ নামে পরিচিত হন।
পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে মাহাথির বলেন, চিকিৎসাবিদ্যার মানুষ রাজনীতিতে বাস্তববাদী সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন—এই বিশ্বাসই তাঁকে রাজনীতিতে উদ্বুদ্ধ করে।
রাজনীতিতে হাতেখড়ি
মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ১৯৪৬ সালে, মাত্র ২১ বছর বয়সে। তিনি ইউনাইটেড মালয়াস ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনে (ইউএমএনও) যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে এই দলের মনোনয়নে তিনি পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে মালয় সম্প্রদায়ের স্বার্থে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তিনি পার্লামেন্টের আসন হারান।
তবে ১৯৭২ সালে তাঁকে ইউএমএনওতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালে তিনি দলের সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন এবং সিনেটর নিযুক্ত হন। ১৯৭৪ সালে তিনি পুনরায় পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হন এবং শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
টানা ২২ বছর প্রধানমন্ত্রী
১৯৭৬ সালে মাহাথির উপপ্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। ১৯৮১ সালের জুনে তিনি ইউএমএনওর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং একই বছরের জুলাইয়ে ৫৬ বছর বয়সে মালয়েশিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর তিনি টানা ২২ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।
ক্ষমতায় এসে তিনি অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তরের পথে এগিয়ে নেন। শিল্পায়ন, রপ্তানিমুখী উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে জোর দেন। তাঁর নেতৃত্বে ইলেকট্রনিক পণ্য, স্টিল ও অটোমোবাইল শিল্পে মালয়েশিয়ার উত্থান ঘটে। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার, কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, পুত্রাজায়া প্রশাসনিক নগরী ও নর্থ-সাউথ এক্সপ্রেসওয়ে—এসব মেগা প্রকল্প তাঁর আমলের প্রতীক।
১৯৯১ সালে ঘোষিত ‘ভিশন ২০২০’ ছিল তাঁর সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য ছিল মালয়েশিয়াকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর করা। তাঁর নেতৃত্বে মালয়েশিয়া এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
উন্নয়ন বনাম কর্তৃত্ববাদ
মাহাথিরের শাসনামলে মালয়েশিয়ায় মধ্যবিত্ত শ্রেণি সম্প্রসারিত হয়, শিক্ষার হার বৃদ্ধি পায়, দরিদ্রের হার কমে, কর্মসংস্থান ও মাথাপিছু আয় বাড়ে। তবে একই সঙ্গে তাঁর শাসনামল কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার অভিযোগে জর্জরিত ছিল। ১৯৮৭ সালের ‘অপারেশন লালাং’ এবং ১৯৮৮ সালের বিচার বিভাগীয় সংকট বিতর্কিত অধ্যায়। ভিন্নমত দমন, গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
মাহাথিরের সঙ্গে তাঁর শিষ্য আনোয়ার ইব্রাহিমের (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) দ্বন্দ্ব উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৮ সালে আনোয়ারকে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় এবং পরে সমকামিতা ও দুর্নীতির মামলায় তাঁর কারাদণ্ড হয়। আনোয়ার এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।
অবসর ও প্রত্যাবর্তন
২০০৩ সালের অক্টোবরে মাহাথির স্বেচ্ছায় প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “একনায়কেরা কি কখনো পদত্যাগ করে? যদি কোনো একনায়ক নিজে থেকে পদ ছাড়েন, তাহলে তাঁকেও একনায়ক বলা যাবে।” তিনি আরও বলেন, তাঁর অন্যতম বড় আফসোস ২০০৩ সালে ৭৮ বছর বয়সে অবসর নেওয়া।
২০০৮ সালের মে মাসে তৎকালীন সরকার মাহাথির প্রশাসনের আমলের দুর্নীতির তদন্ত শুরু করে। ২০১৮ সালে নাজিব রাজাকের দুর্নীতির জেরে ৯২ বছর বয়সে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন। পুরোনো বিরোধ ভুলে আনোয়ারের সঙ্গে জোট গঠন করে ‘পাকাতান হারাপান’ জোট গঠন করেন। এই জোট ২০১৮ সালের ৯ মে নির্বাচনে জয়ী হয় এবং ১০ মে ৯৪ বছর বয়সে মাহাথির বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দুই বছর পর ক্ষমতা আনোয়ারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার কথা থাকলেও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাহাথির হঠাৎ পদত্যাগ করেন। এতে জোট সরকারের পতন হয় এবং মুহিউদ্দিন ইয়াসিন ক্ষমতায় আসেন। ২০২২ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে মাহাথির নিজের সংসদীয় আসন হারান। তিনি মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পান। ১৯৬৯ সালের পর এই প্রথম তিনি কোনো নির্বাচনে পরাজিত হন।
উত্তরাধিকার
বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতার মধ্যেও মাহাথির সক্রিয়। তাঁর ভাষায়, “কাজই হলো সবচেয়ে ভালো ওষুধ।” চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাসায় ব্যায়াম করার সময় পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁর মাথায় আঘাত লাগে এবং নিতম্বের হাড়ে ফ্র্যাকচার হয়। গত এপ্রিলের পডকাস্টে তিনি বলেন, “আমি এখন দাঁড়াতে পারি, তবে পা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না।”
মাহাথিরের উত্তরাধিকার নিয়ে তিনি নিজে বলেন, “মানুষ আমাকে কীভাবে মনে রাখবে, তা নিয়ে আমার কোনো চিন্তা নেই।” তবে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম অধ্যয়ন করা হবে।



