ক্লোয়ে চেরি: প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র থেকে হলিউডের পথচলা
ক্লোয়ে চেরি: প্রাপ্তবয়স্ক চলচ্চিত্র থেকে হলিউডে পথচলা

হলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার গল্প অনেক রকম। কেউ ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের স্বপ্ন নিয়ে বড় হন, কেউ আবার মডেলিং থেকে সিনেমায় আসেন। কিন্তু কিছু গল্প আছে, যেগুলো প্রচলিত ছক ভেঙে দেয়। মার্কিন অভিনেত্রী ক্লোয়ে চেরি সেই বিরল ব্যতিক্রমদের একজন। মূলধারার দর্শক তাঁকে চেনেন এইচবিওর আলোচিত সিরিজ ‘ইউফোরিয়া’-এর ‘ফে’ চরিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে। কিন্তু এই পরিচয়ের আগেও তাঁর ছিল আরেকটি জীবন-প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্রশিল্পে একজন পরিচিত পারফরমার হিসেবে।

সেই অতীত কখনো ক্লোয়ে লুকিয়ে রাখেননি। বরং খোলাখুলিই বলেছেন, ওই শিল্প তাঁকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছিল, আবার একই সঙ্গে মানসিক চাপ, সামাজিক বিচার এবং আত্মপরিচয় নিয়ে দীর্ঘ সংগ্রামের মুখেও দাঁড় করিয়েছিল। আর সেই কারণেই ক্লোয়ে চেরির গল্প কেবল একজন অভিনেত্রীর সাফল্যের গল্প নয়; এটি নতুন করে নিজের পরিচয় গড়ে তোলার গল্পও।

পেনসিলভানিয়ার ছোট শহর থেকে

১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ায় জন্ম ক্লোয়ে চেরির। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা ক্লোয়ে ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও শিল্পমাধ্যমের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। তবে বাস্তবতা ছিল কঠিন। পরিবারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ছিল না। কৈশোরেই তিনি বুঝতে পারেন, নিজের খরচ নিজেকেই বহন করতে হবে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

১৮ বছর বয়সে তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্রশিল্পে কাজ শুরু করেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল দ্রুত অর্থ উপার্জনের একটি পথ। অল্প সময়েই তিনি শিল্পটির পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন এবং কয়েক বছরের মধ্যে শত শত প্রযোজনায় অংশ নেন।

জনপ্রিয়তা, কিন্তু ভিন্ন ধরনের

প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনশিল্পে কাজ করে ক্লোয়ে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে সমালোচনাও।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অনেকেই ক্লোয়েকে শুধু তাঁর অতীত পরিচয় দিয়েই মূল্যায়ন করতেন। তিনি পরে একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মানুষ তাঁকে একজন পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি হিসেবে নয়; বরং একটি পেশার পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করে ফেলত। এই অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাসে বড় প্রভাব ফেলেছিল।

অভিনয়ের নতুন স্বপ্ন

ক্লোয়ে কখনোই নিজেকে কেবল একটি শিল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। তিনি মূলধারার চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে অভিনয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হলিউডে সেই সুযোগ পাওয়া সহজ ছিল না। কারণ, প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্রে কাজ করা অনেক শিল্পীকেই মূলধারার বিনোদনজগৎ সহজে গ্রহণ করে না। তাঁদের দক্ষতার চেয়ে অতীতই বেশি আলোচিত হয়। ক্লোয়ের ক্ষেত্রেও একই চ্যালেঞ্জ ছিল।

ভাগ্য বদলে দেয় একটি ভিডিও

২০২২ সালে তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ‘ইউফোরিয়া’-এর নির্মাতা স্যাম লেভিনসন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্লোয়ের কিছু ভিডিও দেখেন। তাঁর স্বাভাবিক অভিনয়ভঙ্গি নির্মাতার নজর কেড়ে নেয়। এরপর ক্লোয়েকে অডিশনের জন্য ডাকা হয়। অডিশন সফল হয়। ‘ইউফোরিয়া’-এর দ্বিতীয় মৌসুমে ‘ফে’ চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি।

‘ফে’: ছোট চরিত্র, বড় প্রভাব

প্রথম দিকে ‘ফে’–কে খুব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে ভাবা হয়নি। কিন্তু ক্লোয়ের অভিনয় দর্শকদের এতটাই আকৃষ্ট করে যে চরিত্রটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফে একদিকে হাস্যরসের জন্ম দেয়, অন্যদিকে মাদক, সহিংসতা ও অনিশ্চয়তায় ভরা এক তরুণীর মানসিক অবস্থাও ফুটিয়ে তোলে। সমালোচকেরা বলেন, চরিত্রটির সরলতা, ভঙ্গুরতা ও অদ্ভুত হাস্যরসকে বাস্তব করে তুলেছেন ক্লোয়ে। অনেক দর্শকই পরে অবাক হয়ে জানতে পারেন, এটাই ছিল তাঁর প্রথম বড় মূলধারার অভিনয়।

অতীত নিয়ে কোনো আড়াল নয়

হলিউডে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর অনেকেই হয়তো অতীত মুছে ফেলতে চাইতেন। ক্লোয়ে সেই পথ বেছে নেননি। ক্লোয়ে স্পষ্ট বলেছেন, তাঁর অতীতই তাঁকে আজকের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে। তিনি সেটি অস্বীকার করেন না, আবার সেটির মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখতেও রাজি নন। ক্লোয়ে মতে, একজন শিল্পীকে তাঁর বর্তমান কাজ দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত, অতীত দিয়ে নয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাপ

ক্লোয়ে চেরি আরেকটি বিষয় নিয়ে বারবার কথা বলেছেন, নারীদের চেহারা নিয়ে অনলাইন সমালোচনা। ‘ইউফোরিয়া’ মুক্তির পর তাঁর ঠোঁট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মন্তব্য হয়। কেউ বলেন, তিনি অতিরিক্ত ফিলার ব্যবহার করেছেন, কেউ তাঁর চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করেন। ক্লোয়ে পরে জানান, এসব মন্তব্য তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলেছিল। তিনি বলেন, মানুষের চেহারা নিয়ে বিচার করা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা

ক্লোয়ে খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক সমস্যা, উদ্বেগ ও আত্মবিশ্বাসের সংকট নিয়েও প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বিনোদনজগতে সব সময় নিখুঁত দেখানোর চাপ থাকে। সেই চাপ থেকে অনেক শিল্পী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি মনে করেন, এসব বিষয় লুকিয়ে রাখার বদলে আলোচনা হওয়া উচিত।

মডেলিং ও ফ্যাশনের জগতে

‘ইউফোরিয়া’-এর সাফল্যের পর ক্লোয়ে শুধু অভিনয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডের প্রচারণায় অংশ নেন। ফ্যাশন উইকের সামনের সারিতে তাঁকে নিয়মিত দেখা যায়। বিভিন্ন ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদেও জায়গা করে নেন। তাঁর ব্যতিক্রমী স্টাইল ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি তাঁকে ফ্যাশন অঙ্গনেও পরিচিত মুখে পরিণত করেছে।

নতুন অধ্যায়: আত্মজীবনী

সম্প্রতি ক্লোয়ে ঘোষণা দিয়েছেন, তাঁর আত্মজীবনী ‘সামহয়ার ডার্ক অ্যান্ড হট’ প্রকাশিত হবে। বইটিতে ক্লোয়ে শৈশব, প্রাপ্তবয়স্কদের চলচ্চিত্রশিল্পে কাজের অভিজ্ঞতা, হলিউডে প্রবেশের সংগ্রাম, মানসিক স্বাস্থ্য, আসক্তি, আত্মপরিচয় এবং নতুন জীবন গড়ে তোলার গল্প তুলে ধরবেন। ক্লোয়ের ভাষায়, এটি কেবল একটি স্মৃতিকথা নয়; বরং ভুল, শিক্ষা, ভয় এবং নতুন করে শুরু করার সাহসের গল্প।