দিতির জন্মদিনে স্মরণ: রাজ রাজ্জাককে 'বাবা' ডাকার কারণ ও এক জীবনের গল্প
বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র পারভীন সুলতানা দিতির জন্মদিনে তাকে স্মরণ করছেন সহশিল্পী ও ভক্তরা। ১৯৬৫ সালের ৩১ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে জন্মগ্রহণকারী এই গুণী অভিনেত্রী গ্ল্যামার ও অভিনয় দক্ষতার সমন্বয়ে দর্শকের প্রিয় মুখ হয়ে উঠেছিলেন। তার জন্মদিন উপলক্ষ্যে উঠে এসেছে রাজ রাজ্জাকের সঙ্গে তার অনন্য সম্পর্কের গল্প।
রাজ রাজ্জাকের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন
বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়ক রাজ রাজ্জাক জীবদ্দশায় এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন, "দিতি আমাকে বাবা বলে ডাকত।" এই ডাকের পেছনে রয়েছে একটি গভীর পারিবারিক সম্পর্ক। রাজ রাজ্জাক ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, দিতির স্বামী সোহেল চৌধুরী ও রাজ রাজ্জাকের ছেলে বাপ্পা একসঙ্গে পড়ালেখা করেছে। এই শিক্ষাগত সম্পর্কের সূত্র ধরে দিতি রাজ রাজ্জাকের পরিবারেরই একজন সদস্য হিসেবে গণ্য হতেন।
রাজ রাজ্জাক আরও জানিয়েছিলেন, "সেই হিসাবে দিতি আমাদের পরিবারেরই একজন ছিল। আমাদের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।" এই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একটি অনন্য উদাহরণ, যেখানে পেশাগত সম্পর্কের বাইরেও গড়ে উঠেছিল আত্মীয়তার বন্ধন।
দিতির ব্যক্তিগত জীবন ও পেশাগত যাত্রা
চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন দিতি। তাদের সংসারে জন্ম নিয়েছিল দুই সন্তান-লামিয়া ও দীপ্ত। দুর্ভাগ্যবশত স্বামীর মৃত্যুর পর দিতি পরবর্তীতে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনকে বিয়ে করলেও সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি। তবে পর্দায় দিতি-ইলিয়াস কাঞ্চন জুটির রসায়ন ছিল অত্যন্ত দর্শকপ্রিয়।
ইলিয়াস কাঞ্চন এক সাক্ষাৎকারে দিতির সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে বলেন, "আমাদের প্রথম ছবি ছিল 'ভাই-বন্ধু'। সব মিলিয়ে আমরা প্রায় ৩০টির মতো সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করেছি। দিতি খুব ভালো অভিনেত্রী ছিল। জনপ্রিয়তার পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছে।"
চলচ্চিত্রে অভিষেক ও ক্যারিয়ারের বিস্তৃতি
প্রায় চার দশক আগে এফডিসির 'নতুন মুখের সন্ধানে' কার্যক্রমের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে পা রাখেন দিতি। ১৯৮৪ সালে চলচ্চিত্রে যাত্রা শুরু করলেও তার প্রথম অভিনীত ছবি 'ডাক দিয়ে যাই' মুক্তি পায়নি। পরে 'আমিই ওস্তাদ' সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। অল্প সময়ের মধ্যেই একের পর এক সিনেমায় অভিনয় করে তিনি নিজেকে নিয়ে যান সাফল্যের শিখরে।
দীর্ঘ ৩১ বছরের ক্যারিয়ারে দিতি শুধু সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি:
- নাটকে অভিনয় ও পরিচালনা
- রান্নাবিষয়ক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা
- গান গাওয়া ও একক গানের অ্যালবাম প্রকাশ
- বিজ্ঞাপনচিত্রে কাজ
জীবনের শেষ পর্ব ও উত্তরাধিকার
দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ২০১৬ সালের ২০ মার্চ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই অভিনেত্রী। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের দত্তরপাড়া গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার কবরের পাশেই তাকে সমাহিত করা হয়।
গ্ল্যামার, অভিনয় আর ব্যক্তিত্ব-সব মিলিয়ে দিতি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নাম, যিনি আজও দর্শকের স্মৃতিতে অমলিন রয়ে গেছেন। রাজ রাজ্জাকের সঙ্গে তার 'বাবা' সম্পর্কের গল্প থেকে শুরু করে ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে পর্দার রসায়ন-সব মিলিয়ে দিতির জীবনকাহিনী বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।



