প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলেকে লেখা চিঠি
ছেলে সহজের উদ্দেশে লেখা একটি হৃদয়স্পর্শী চিঠিতে সদ্য প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় তার অভিনয় জীবনের সংগ্রাম, মায়ের আত্মত্যাগ এবং বাংলা ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। এই চিঠিটি তিনি ফাদারস ডে উপলক্ষে লিখতে বসেন, যদিও তার বাবা নিজে কখনোই এই দিনটি আলাদাভাবে উদযাপন করতেন না।
অভিনয় জগতে প্রবেশের গল্প
রাহুল তার চিঠিতে উল্লেখ করেন, তিনি এবং সহজের মা যখন প্রথম অভিনয় জগতে প্রবেশ করেন, তখন তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ২১ ও ১৪ বছর। তারা দুজনই ছিলেন সাধারণ পরিবার থেকে আসা। রাহুলের বাবা ছিলেন একজন সরকারি চাকুরে, আর সহজের নানা ছিলেন বেহালার একজন অ্যাকাউন্টস শিক্ষক।
রাহুল লিখেছেন: "আমরা দুজন এই ইন্ডাস্ট্রির কিছুই জানতাম না। শুধু জানতাম, মন দিয়ে অভিনয়টুকু করতে।" তিনি আরও যোগ করেন, উপার্জন ও ক্ষমতার আতসকাঁচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই।
মায়ের আত্মত্যাগের কথা
চিঠিতে রাহুল সহজের মায়ের সংগ্রামের কথা বিশদভাবে বর্ণনা করেন। যখন তারা প্রথম জানতে পারেন যে সহজ তাদের জীবনে আসছেন, তখন তারা আনন্দে পাগল হয়ে যান। সহজের মা গুচ্ছের অ্যাপ ডাউনলোড করে প্রতিদিন রাহুলকে আপডেট দিতেন।
সহজের জন্মের পর তার মা কখনোই বাজার চলতি বেবিফুড কিনে তাকে খাওয়াননি। সবকিছু নিজের হাতে বানাতেন, এমনকি যদি সারা দিন লাগে তবুও। রাহুল লিখেছেন: "সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কতগুলো ছুরি গাঁথা আছে, দেখতে পাই না।"
বাংলা ভাষার উত্তরাধিকার
রাহুল তার ছেলেকে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার দান করার কথা উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন: "আমি তোমাকে আমার ভাগের সবকটা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি।" শুধু তাই নয়, তিনি বাংলা ভাষার সমস্ত উপভাষা ও ডায়ালেক্টের ঐশ্বর্য ছেলেকে দান করেন।
একটি উত্তরহীন প্রশ্ন
চিঠির শেষ অংশে রাহুল একটি মর্মস্পর্শী ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। যখন সহজ সদ্য মায়ের সঙ্গে আলাদা হন, প্রায় এক বছর পর তিনি তাদের বেডরুমে ঢুকে রাহুলকে প্রশ্ন করেন: "আমি এই ঘরে থাকতাম না, বাবা?"
রাহুল উত্তর দিয়েছিলেন: "হ্যাঁ।" তারপর সহজ জিজ্ঞাসা করেন: "তারপর কী হলো? এখন আর থাকি না কেন?" রাহুল লিখেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর সেদিনও ছিল না, আজও নেই। তিনি ছেলের কাছে ক্ষমা চান এই উত্তর দিতে না পারার জন্য।
এই চিঠিটি শুধু একজন বাবার ছেলের প্রতি ভালোবাসাই নয়, বরং একটি পরিবারের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গল্প বলে। রাহুলের শব্দগুলো পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে, বিশেষ করে যারা পিতৃ-মাতৃ ভালোবাসা ও জীবন সংগ্রামের মূল্য বুঝতে পারেন।



