গীতা বসরা: বলিউডের আলোচিত অভিনেত্রীর জীবনকাহিনি
বলিউডের ঝলমলে জগতে এমন অনেক মুখ রয়েছেন, যাঁরা অল্প সময়ের জন্য পর্দায় এসেও দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। তেমনই একজন অভিনেত্রী গীতা বসরা। অভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বিশেষ করে ভারতীয় ক্রিকেটার হরভজন সিংয়ের সঙ্গে দীর্ঘ প্রেম ও পরবর্তী বিয়ে তাঁকে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে। আজ ১৩ মার্চ এই অভিনেত্রীর জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে ফিরে দেখা যাক তাঁর জীবনের নানা অধ্যায়—সংগ্রাম, অভিনয়জীবন, প্রেম, পরিবার ও অর্জনের গল্প।
বিদেশে জন্ম ও বলিউডের স্বপ্ন
গীতা বসরা ১৯৮৪ সালের ১৩ মার্চ ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবার মূলত পাঞ্জাবি শিখ বংশোদ্ভূত। মা–বাবা যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও পরিবারে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রভাব ছিল গভীর। ছোটবেলা থেকেই অভিনয় ও বিনোদনজগতের প্রতি তাঁর আলাদা আকর্ষণ ছিল। ব্রিটেনে বড় হওয়ায় প্রথম দিকে গীতার জীবনের পথটা ছিল একেবারেই আলাদা। কিন্তু কৈশোরেই তিনি ঠিক করেন, একদিন তিনি চলচ্চিত্রে কাজ করবেন। সে স্বপ্নই তাঁকে টেনে আনে মুম্বাইয়ে; যে শহর হাজারো স্বপ্নবাজের মতোই তাঁর কাছেও ছিল এক সম্ভাবনার শহর।
বলিউডে জায়গা পাওয়ার সংগ্রাম
বিদেশে বড় হওয়া একজন তরুণীর জন্য বলিউডে জায়গা করে নেওয়া সহজ ছিল না। ভাষা, সংস্কৃতি, প্রতিযোগিতা—সব মিলিয়ে সামনে ছিল নানা বাধা। অভিনয় শেখার জন্য তিনি মুম্বাইয়ে এসে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন এবং বিভিন্ন অডিশনে অংশ নিতে শুরু করেন। সময়টা ছিল গীতার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ—সবকিছুই ছিল চ্যালেঞ্জে ভরা। অনেক অডিশনে ব্যর্থ হয়েছেন, প্রত্যাখ্যানও শুনেছেন অসংখ্যবার। কিন্তু স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস হারাননি। অবশেষে তাঁর সেই অপেক্ষার অবসান ঘটে ২০০৬ সালে।
বড় পর্দায় অভিষেক
২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া চলচ্চিত্র ‘দিল দিয়া হ্যায়’-এর মাধ্যমে বলিউডে অভিষেক ঘটে গীতা বসরার। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন ইমরান হাশমি ও আমিশা প্যাটেল। থ্রিলার ঘরানার ছবিটি বক্স অফিসে খুব বড় সাফল্য না পেলেও গীতাকে নতুন মুখ হিসেবে পরিচিত করে তোলে। পর্দায় গীতার উপস্থিতি, আত্মবিশ্বাসী অভিনয় ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব দর্শকদের নজর কাড়ে। যদিও প্রথম ছবির পরপরই বড় সাফল্য আসেনি, তবু তিনি ধীরে ধীরে বলিউডে নিজের জায়গা তৈরি করতে থাকেন।
আলোচনায় আসা অভিনয়
গীতা বসরার ক্যারিয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র ‘দ্য ট্রেন’। এ ছবিতেও তিনি অভিনয় করেন ইমরান হাশমির বিপরীতে। ছবির গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল এবং সেই সঙ্গে গীতার উপস্থিতিও দর্শকের নজর কাড়ে। পরে গীতা অভিনয় করেন ‘জিলা গজিয়াবাদ’ ছবিতে। ছবিতে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন সঞ্জয় দত্ত, আরশাদ ওয়ার্সি, বিবেক ওবেরয়। যদিও ছবিটি সমালোচকদের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পায়, তবু গীতা বসরার উপস্থিতি আলোচনায় ছিল। এ ছাড়া গীতা কয়েকটি মিউজিক ভিডিও ও পাঞ্জাবি প্রজেক্টেও কাজ করেছেন। অভিনয়জীবন দীর্ঘ না হলেও বলিউডে তাঁর উপস্থিতি দর্শকদের মনে রয়ে গেছে।
ক্রিকেটার হরভজন সিংয়ের সঙ্গে প্রেম
গীতা বসরার জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় সম্ভবত তাঁর প্রেমের গল্প। ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম তারকা হরভজন সিংয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিন মিডিয়ার নজরে ছিল। শোনা যায়, হরভজন প্রথম গীতাকে দেখেন টেলিভিশনে একটি গানের ভিডিওতে। তখনই তিনি মুগ্ধ হন অভিনেত্রীর প্রতি। এরপর পরিচিতদের মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেন। প্রথম দিকে গীতা নাকি খুব একটা সাড়া দেননি। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁদের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে, যা পরে রূপ নেয় প্রেমে। প্রায় আট বছর ধরে তাঁদের সম্পর্ক টিকে ছিল। এই দীর্ঘ সম্পর্কের সময় দুজনকেই নানা গুঞ্জনের মুখে পড়তে হয়েছে। তবু সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৫ সালে তাঁরা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হন।
রাজকীয় বিয়ে
২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর পাঞ্জাবের জলন্ধরে অনুষ্ঠিত হয় গীতা–হরভজনের বিয়ে। সেই বিয়ে ছিল ভারতীয় ক্রীড়া ও বিনোদনজগতের অন্যতম আলোচিত আয়োজন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ক্রিকেট ও চলচ্চিত্রজগতের বহু তারকা। বিয়ের অনুষ্ঠানে গীতা বসরার ঐতিহ্যবাহী লেহেঙ্গা এবং রাজকীয় সাজ বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। আর হরভজন সিংও ছিলেন দৃষ্টিনন্দন শেরওয়ানিতে। এ বিয়ের মাধ্যমে দুই ভিন্ন জগৎ—ক্রিকেট ও বলিউড একসুতায় বাঁধা পড়ে।
পরিবার ও মাতৃত্ব
বিয়ের এক বছর পর ২০১৬ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান জন্ম নেয়। কন্যাসন্তানের নাম রাখা হয় হিনায়া হির প্লাহা। পরে ২০২১ সালে তাঁদের ঘরে আসে পুত্রসন্তান জোভান বীর সিং প্লাহা। মাতৃত্বের পর গীতা বসরা অভিনয়জগৎ থেকে অনেকটাই দূরে সরে যান। তিনি এখন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো এবং সন্তানদের বড় করে তোলাতেই বেশি মনোযোগী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাঝেমধ্যেই তিনি পরিবার নিয়ে বিভিন্ন মুহূর্ত ভাগ করে নেন, যা ভক্তদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
সম্পদের পরিমাণ
অভিনয়জীবন খুব দীর্ঘ না হলেও গীতা বসরার আর্থিক অবস্থান যথেষ্ট সচ্ছল। চলচ্চিত্র, বিজ্ঞাপন ও অন্যান্য কাজের মাধ্যমে তিনি ভালো পারিশ্রমিক পেয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গীতা বসরার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বলে ধারণা করা হয়। অন্যদিকে তাঁর স্বামী হরভজন সিং দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ার, আইপিএল এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক। দুজনের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ভারতীয় মুদ্রায় কয়েক শ কোটি রুপির বেশি বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে তাঁরা ভারতের অন্যতম আলোচিত তারকা দম্পতিদের একজন।
আলোচনার বাইরের জীবন
গীতা বসরা সব সময়ই তুলনামূলকভাবে ব্যক্তিগত জীবনকে আড়ালে রাখতে পছন্দ করেছেন। বলিউডের ঝলমলে পার্টি বা বিতর্কে তাঁকে খুব একটা দেখা যায় না। অভিনয় ছেড়ে দেওয়ার পরও তিনি বিনোদনজগতের সঙ্গে সংযোগ রেখেছেন। বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ ও ফ্যাশন ইভেন্টে তাঁকে দেখা যায়। অনেকেই মনে করেন, তিনি চাইলে অভিনয়ে আরও দীর্ঘ সময় থাকতে পারতেন। কিন্তু পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তই তাঁর জীবনের নতুন পথ নির্ধারণ করেছে।
নতুন অধ্যায়ের জীবন
অভিনয়জীবন থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও গীতা বসরা নিজের জীবনকে নতুনভাবে উপভোগ করছেন। পরিবার, সন্তান এবং ব্যক্তিগত সময়—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন এখন অনেক বেশি শান্ত ও পরিপূর্ণ। মাঝেমধ্যে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ফিটনেস, ভ্রমণ কিংবা পারিবারিক মুহূর্তের ছবি শেয়ার করেন। এসব পোস্টে ভক্তদের ভালোবাসা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। বিদেশে বড় হওয়া এক তরুণীর বলিউডে এসে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প, দীর্ঘ প্রেমের সম্পর্কের পর সফল দাম্পত্য এবং মাতৃত্বের আনন্দ—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন এক পূর্ণাঙ্গ যাত্রা।
