থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান: তারকা থেকে গেম-চেঞ্জার
থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান: তারকা থেকে গেম-চেঞ্জার

তামিল সিনেমার পর্দা কাঁপানো তারকা থেকে রাজনীতির ময়দানের এই যাত্রা অনেককেই অবাক করে দিয়েছে। তবে এর শুরুটা ছিল বিতর্কে ভরা। সে পথ পেরিয়েই আজ তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছেন ‘থালাপতি’ বিজয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার দল ‘তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম’ (টিভিকে) ২৩৪টি আসনের মধ্যে ১০৮টিতে জয় পেয়ে একক বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে যা বিশ্লেষকদের মতে, তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

ভক্তদের আবেগ থেকে রাজনৈতিক শক্তি

ভক্তদের কাছে তিনি শুধু অভিনেতা নন, এক ধরনের আবেগ। তার ‘থালাপতি’ উপাধিই তার প্রমাণ যার অর্থ সেনাপতি। এই জনপ্রিয়তাই পরবর্তীতে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়। থালাপতির এই পারফরম্যান্সকে রাজ্যের রাজনীতির জন্য একটি ‘গেম-চেঞ্জার’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ৫১ বছর বয়সী বিজয় তামিল সিনেমার অন্যতম জনপ্রিয় তারকা, আর তার এই ‘ব্র্যান্ড নেম’-ই টিভিকে-কে সামনে এগিয়ে নিতে মূল ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচনী প্রচারে বিজয় একবার বলেছিলেন, ‘২৩৪টি নির্বাচনী এলাকাতেই বিজয়ই প্রার্থী’।

নাটকীয় শুরু ও বিতর্ক

নির্বাচনে জেতার মানদণ্ডে বিজয়ের এই রাজনৈতিক যাত্রা সফল হলেও এর শুরুটা ছিল বেশ নাটকীয়। মাত্র ছয় বছর আগে তার বাবা-মা যখন তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু করতে চেয়েছিলেন, তিনি তাদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিলেন। শুরুটা ছিল ১৯৮৪ সালে নিজের বাবা পরিচালক-প্রযোজক এস এ চন্দ্রশেখরের হাত ধরে ‘ভেট্টি’ সিনেমায় শিশু অভিনেতা হিসেবে। তবে ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘সেন্থুরপান্ডি’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি মূলধারায় জনপ্রিয়তা পান। পরে অ্যাকশন ও বাণিজ্যিক ছবিতে সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ভক্তদের কাছে ‘থালাপতি’ উপাধি অর্জন করেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ফ্যান ক্লাব থেকে রাজনৈতিক কাঠামো

তামিল ও তেলুগু চলচ্চিত্রে তারকাদের প্রতি ভক্তদের ভক্তি প্রবাদপ্রতিম হলেও বিজয়ের ভক্তদের একাগ্রতা ছিল ভিন্ন মাত্রার। কয়েক দশক ধরে ছোট শহর ও গ্রামগুলোতে তার ফ্যান ক্লাবগুলো রক্তদান কর্মসূচির মতো বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক কাজ চালিয়ে আসছিল। ‘অল ইন্ডিয়া থালাপাতি বিজয় মাক্কাল আইয়াক্কাম’-এর ব্যানারে এসব কাজ পরিচালিত হতো। ফলে রাজনৈতিক দল গঠনের শুরুতেই তিনি একটি সুসংগঠিত ক্যাডার-ভিত্তিক সংগঠন পেয়ে যান।

বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে মামলা

২০২০ সালে চন্দ্রশেখর বিজয়ের অনুমতি ছাড়াই ‘বিজয় মাক্কাল আইয়াক্কাম’ (ভিএমআই) কে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধনের চেষ্টা করেন। সেখানে চন্দ্রশেখর নিজেকে সাধারণ সম্পাদক এবং বিজয়ের মা গায়িকা শোভাকে কোষাধ্যক্ষ মনোনীত করেন। চন্দ্রশেখর তখন যুক্তি দিয়েছিলেন, বিজয়ের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেও তিনি অনুমতি ছাড়াই ফ্যান ক্লাব করেছিলেন। পরবর্তীতে বিজয়ের মা শোভা জানান, কেবল বিজয়ই তার রাজনৈতিক প্রবেশের সিদ্ধান্ত নেবেন এবং তিনি তার স্বামীর পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বিজয় প্রকাশ্যে নিজেকে ভিএমআই থেকে দূরে সরিয়ে নেন এবং নিজের বাবা-মাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে ভিএমআই বিলুপ্ত করা হয়।

ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রস্তুতি

এরপর ধীরে ধীরে নিজের শর্তে রাজনৈতিক প্রস্তুতি নিতে থাকেন বিজয়। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি তার দল টিভিকে চালু করেন। যদিও তার রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল আরও আগে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় থাকা তার ফ্যান ক্লাবগুলোর মাধ্যমে। ‘অল ইন্ডিয়া থালাপাতি বিজয় মাক্কাল আইয়াক্কাম’-এর ব্যানারে এসব ফ্যান ক্লাব সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করত, যা পরবর্তীতে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামোতে রূপ নেয়। ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম প্রতিষ্ঠা করেন বিজয়।

সিস্টেম পরিবর্তনের প্রতীক

তিনি শুরু থেকেই নিজেকে ‘সিস্টেম পরিবর্তনের’ প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান, তরুণদের আকৃষ্ট করার কৌশল এবং নারী ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা সব মিলিয়ে দ্রুতই তিনি একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে উঠে আসেন। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে পর্যন্ত বিজয় বরাবরই ছিলেন কিছুটা সংযত ও প্রচারবিমুখ। এমনকি ২০২১ সালেও তিনি জানিয়েছিলেন, রাজ্যে বড় কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা নেই। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালে তিনিও সিদ্ধান্ত নেন সরাসরি মাঠে নামার।

নতুন রাজনৈতিক শক্তি

রাজ্যের প্রচলিত দুই শক্তি এম কে স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন ডিএমকে এবং এডাপ্পাদি কে পালানিস্বামীর এআইএডিএমকে এর মাঝে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে টিভিকে। বিশ্লেষকদের মতে, জয়ললিতার মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেটিকেই কাজে লাগিয়েছেন বিজয়। পর্দার ‘থালাপতি’ এবার বাস্তবেও নেতৃত্বের পরীক্ষায় নেমেছেন। এখন দেখার বিষয় এই নাটকীয় উত্থান তিনি কত দূর নিয়ে যেতে পারেন।