একটি আর্টিকেলে পড়া সাতটি গুণের তালিকা—চরিত্র, সম্মান দেওয়া ও নেওয়ার ক্ষমতা, স্নেহশীলতা, বুদ্ধিমত্তা, আত্মবিশ্বাস, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, এবং বিনয় ও ভদ্রতা—নিয়ে পুরুষদের আদর্শ স্ত্রী প্রত্যাশার বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করা হলো। প্রতিটি গুণের আলোচনা এবং পুনর্মূল্যায়ন নিচে দেওয়া হলো।
চরিত্র: পুরুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ
অনেক পুরুষ নিজে চরিত্রহীন হলেও চরিত্রবান স্ত্রী চান। বিবাহিত নারীর চরিত্র খারাপ বলতে স্বামীর অনুমতি ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলা, দেখা করা বা প্রেম করাকে বোঝানো হয়। অনেক স্বামী স্ত্রীকে বাইরে কাজ করতে দিতে চান না, কারণ অন্য পুরুষের সঙ্গে সখ্য বাড়ার ভয় থাকে। অথচ নিজেরা কাজের জায়গায় নারী সহকর্মীর সাথে উষ্ণ সম্পর্ক রাখেন।
শিক্ষিত মেয়েরা আদর্শ বউ হওয়ার জন্য ঘরে বেকার বসে থাকেন, কারণ স্বামী ও শ্বশুরবাড়ি চান না। আধুনিক দৃষ্টিতে চরিত্রহীন বলে নির্দিষ্ট শব্দ নেই; হাজবেন্ড রেখে অন্য কারও সাথে সম্পর্ক করলে তাকে অসৎ বলা যায়, কিন্তু সরাসরি চরিত্রহীন বলা যায় না। চরিত্র মানে নৈতিকতা, সততা, ভদ্রতা ও শিষ্টাচার। যেসব নারী নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন, তাদের দমানোর জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ চরিত্রহীন অপবাদ দেয়। তবে পর্দা করা নারীর চেয়ে সৎ নারী আদর্শ বলে বিবেচিত।
সম্মান দেওয়া ও নেওয়ার ক্ষমতা
প্রত্যেক পুরুষ স্ত্রীর কাছ থেকে সম্মান আশা করেন, যাতে তিনি গর্ব করতে পারেন। কিন্তু কয়জন হাজবেন্ড স্ত্রীর বাবা-মায়ের খোঁজ নেন? সম্মান দিতে না জানলে সম্মান পাওয়া যায় না। আদর্শ স্ত্রী মানে স্বামীর পরিবারের সবার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়া নয়; স্বামীকে স্ত্রী ও তার পরিবারকে সম্মান দিতে হবে। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন স্ত্রীর কাছে সম্মান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভালোবাসা কম হলেও চলে কিন্তু অসম্মান মানা যায় না।
একসময় নারীরা লেখাপড়ার সুযোগ পেত না, অল্প বয়সে বিয়ে হতো, এবং শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার ও স্বামীর অবহেলা সহ্য করত। স্বামীর অনুমতি ছাড়াই একাধিক বিয়ে হতো। নারীরা প্রতিবাদ করতে পারত না, তাদের বলা হতো 'মাইয়া মানুষ'। কিন্তু সময় বদলেছে; নারীরা এখন স্বনির্ভর, প্রতিবাদ করতে পারে, এমনকি লোভী স্বামীদের ছেড়ে যেতে দ্বিধা করে না। পুরুষের মানসিকতার উন্নতি না হলেও নারীর চিন্তাচেতনা এগিয়েছে।
স্নেহশীলতা: কোমলতার প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
অধিকাংশ পুরুষ হাসিখুশি নারী পছন্দ করেন, কিন্তু নারীর রাগ ও অভিমান বুঝতে চান না। মানুষের কোমলতা ও সহনশীলতা নষ্ট হয় স্বামী চরিত্রহীন বা পরনারীতে আসক্ত হলে, অথবা সংসারে মাত্রারিক্ত অভাব-অনটন থাকলে। তখন নারী খিটমিটে ও কর্কশ আচরণ করতে বাধ্য হন। প্রতিকূলতা মেনে নিয়ে সংসার করলে আদর্শ স্ত্রী থাকা যায়, কিন্তু প্রতিবাদ করলে শনি!
বুদ্ধিমত্তা: বোকা নয়, বুদ্ধিমতী স্ত্রী চান পুরুষ
একসময় পুরুষেরা বোকা ও সুন্দরী মেয়ে পছন্দ করত, কিন্তু এখন বুদ্ধিমতী বউ খোঁজে। তারা উপলব্ধি করেছে, বিয়ে মানে শোপিস নয়, বরং জীবনের সব টানাপোড়েন ভাগ করে নেওয়ার মতো সহযোদ্ধা। কিন্তু সমাজে ক্ষমতাধর পুরুষের সংখ্যা বেশি, যারা মানসিক নির্যাতন করে। নারীদের আগে স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি; মেধাবী মেয়েরা একা হয় না, তারা সমাজের আলো।
আত্মবিশ্বাস: নারীর শক্তি
আত্মবিশ্বাসী নারী ঘরে ও বাইরে দক্ষতার সাথে ব্যালান্স রাখতে পারেন। বর্তমানে পুরুষেরা উপলব্ধি করছে যে আত্মবিশ্বাসী জীবনসঙ্গীর সিদ্ধান্ত ও মতামত তাদের পথ সহজ করে। কিন্তু অনেক পরিবার নারীর আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তাকে নেতিবাচকভাবে দেখে। যত বাধাই আসুক, আত্মবিশ্বাস অটুট থাকলে নারী পিছিয়ে পড়বে না, আদর্শ বধূ না হলেও।
উচ্চাকাঙ্ক্ষা: নেগেটিভ নয়, বরং জীবনের গতি
উচ্চাকাঙ্ক্ষা মানে কেবল টাকা বা ক্যারিয়ার নয়; বরং নতুন কিছু জানতে চাওয়া, পরিবেশে মানিয়ে চলা, সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। সফলতা মানে আত্মতৃপ্তি ও আত্মসন্তুষ্টি। বর্তমানে মেয়েরা ঘরকন্না ছাড়াও প্লেন চালাচ্ছে, পাহাড়ে উঠছে, খেলাধুলায় চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে, ব্যবসা সামলাচ্ছে। এমন সাপোর্টিভ সঙ্গী সবাই চায়, আর এমন বউই আদর্শ। তবে মধ্যযুগের অন্ধকারে যারা নিমজ্জিত, তাদের কথা আলাদা।
বিনয় ও ভদ্রতা: আত্মসম্মান বনাম মুখোশ
বিনয়ী নারীর কাজ মিষ্টি ভাষায় কথা বলা, অন্যের চাওয়াকে প্রাধান্য দেওয়া, নিরহংকার থাকা, পোশাকে শালীনতা বজায় রাখা, এবং ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়া। সমাজ ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিনয়ী মেয়েরা এগিয়ে থাকে। কিন্তু লেখকের মতে, কেন সবকিছু সহ্য করে বিনয়ী খেতাব পেতে হবে? আগে আত্মসম্মান ও নীতিবোধ, তারপর ভদ্রতা। মুখোশ পরে অভিনয় করে ভালো হওয়ার ভণ্ডামি আর নেই। যা অনৈতিক ও অসৎ, তার বিরুদ্ধে কথা বলুন; শিরদাঁড়া সোজা রাখুন, বেয়াদব খেতাব পেলেও সত্য বলা শিখুন। কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়, 'বিশ্বের যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।'



