মুস্তাফা মনোয়ার: পাপেটের রাজ্য থেকে সত্যজিৎ রায়ের প্রশংসা পর্যন্ত
মুস্তাফা মনোয়ার: পাপেটের রাজ্য থেকে সত্যজিৎ রায়ের প্রশংসা

সত্যজিৎ রায় একবার তারেক মাসুদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, ‘তোমাদের ঢাকা টেলিভিশনে একটা নাটক দেখেছিলাম, অসাধারণ! রক্তকরবী, কে করেছেন?’ তারেক মাসুদ উত্তর দেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার, আপনার কাজের একনিষ্ঠ ভক্ত।’ সত্যজিৎ জবাব দেন, ‘ও, ওনার নাম শুনেছি, ভালো জলরঙে ছবি আঁকেন।’ ১৯৮৫ সালে তারেক মাসুদের সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের এই কথোপকথন ‘চলচ্চিত্রযাত্রা’ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ আছে।

সত্যজিৎ রায়ের প্রশংসায় নোবেল পাওয়ার অনুভূতি

সত্যজিৎ রায়ের এই প্রশংসা শুনে মুস্তাফা মনোয়ার স্ত্রীকে ডেকে বলেছিলেন, ‘এই শুনেছ, আমার তো নোবেল পাওয়া হয়ে গেছে।’ সত্যজিৎ আসলে মুস্তাফা মনোয়ারের মাত্র দুটি গুণের কথা জানতেন—টিভি নাটক নির্মাণ ও জলরঙের চিত্রকলা। অথচ মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। তিনি চিত্রকলায় ডিগ্রিধারী, সংগীতে পারদর্শী, হিস মাস্টার্স ভয়েস প্রতিযোগিতায় সেরা গায়ক নির্বাচিত, মঞ্চ নাটক নির্দেশনা, সংগীত ও নৃত্য পরিচালনা করেছেন। শিক্ষকতা করেছেন আর্ট কলেজে, কাজ করেছেন টেলিভিশনে। শিল্পকলা একাডেমী, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও এফডিসির শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে (২০১২) তিনি বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর চেয়ারম্যান।

পাপেট শিল্পের পথিকৃৎ

বাংলাদেশে পাপেট বলতে যা বোঝায়, তার শুরু ও বর্তমান অবস্থায় পৌঁছানোর একক কৃতিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের। দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’, ষষ্ঠ সাফ গেমসের ‘অদম্য’, একাদশ সাফ গেমসের দোয়েল ‘কুটুম’—এসব মাসকট তাঁর সৃষ্টি। ‘মীনা’ কার্টুন ও ‘সিসিমপুরের’ মতো অনুষ্ঠানের পেছনেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

ঝিনাইদহ জেলার মনোহরপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ারের শিক্ষাজীবন শুরু কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। অল্প বয়সে মাকে হারান। পিতা কবি গোলাম মোস্তফা স্কুলশিক্ষক ছিলেন, তাই তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়েছে। কিন্তু গ্রামের প্রতি তাঁর টান অটুট ছিল। তিনি বলেন, ‘একদম ছোটবেলা গ্রামে ছিলাম। কলকাতা থেকে নিয়মিত গ্রামে যেতাম। গ্রামের খোলা মাঠ, নদী—এসব সব সময়েই আমার অসম্ভব ভালো লাগত। শিল্পের ক্ষেত্রে দূর থেকে আরও দূরে দেখার বিষয়টি আমি গ্রাম থেকেই পেয়েছি। দেশ বলতে আমি আমার গ্রামকেই বুঝি।’

কলকাতায় চারুকলা শিক্ষা

নারায়ণগঞ্জ থেকে ম্যাট্রিক পাস করে বিজ্ঞান পড়তে কলকাতায় যান। কিন্তু কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ব্যাচেলর অব ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞান পড়া কঠিন হয়ে পড়ে। পাশের বাড়িতে থাকতেন সৈয়দ মুজতবা আলী, যিনি তাঁর আঁকা ছবি দেখে প্রশংসা করেন এবং বিজ্ঞান বাদ দিয়ে আর্ট কলেজে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। মুস্তাফা মনোয়ারের বড় ভাবি ও সৈয়দ মুজতবা আলী মিলে তাঁকে কলকাতা আর্ট কলেজে নিয়ে যান। তাঁর আঁকা ছবিই ভর্তির পথ তৈরি করে দেয়। ১৯৫৯ সালে আর্ট কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে পাস করেন। এর আগে কলকাতা একাডেমি অব ফাইন আর্টসের নিখিল ভারত চারু ও কারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রাফিক্স শাখায় সোনার পদক এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চারুকলা প্রতিযোগিতায় তেল ও জলরঙ—দুই শাখায় সেরা শিল্পকর্মের জন্য দুটি সোনার পদক পান।

ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতা

১৯৬০ সালে জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। জয়নুল আবেদিনের সঙ্গে কলকাতায় পঞ্চম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে দেখা হয়েছিল এবং তিনি পড়া শেষে ঢাকায় আসার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ঢাকা আর্ট কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি নাটকের সেট নির্মাণ, মঞ্চ পরিকল্পনা ও মঞ্চ নাটক নির্দেশনা করেন। তাঁর পরিচালনায় আর্ট কলেজে প্রথম নাটকের প্রদর্শনী হয় রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ দিয়ে। পাঁচ বছর এখানে কাজ করেন।

টেলিভিশনে যোগদান ও দেশপ্রেম

১৯৬৫ সালে ঢাকা টেলিভিশন শুরু হলে কলিম শরাফী ও জামিল চৌধুরী তাঁকে ডাকেন। আর্ট কলেজের চাকরি ছেড়ে টেলিভিশনে যোগ দেন। লক্ষ্য ছিল বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরা, কারণ পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে রেষারেষি ছিল। ১৯৬৭ সাল থেকে নতুন শিল্পী তৈরি ও খোঁজার জন্য অনুষ্ঠান শুরু করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে তিনি ঢাকা টিভিতে পাকিস্তানের পতাকা না দেখানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রাত ১০টার পরিবর্তে ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠান চালিয়ে দেশাত্মবোধক গান প্রচার করেন। ২৩ মার্চ পার হওয়ার পর পতাকা দেখিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন। এর পরদিন থেকে আর টেলিভিশনে যাননি। ২৫ মার্চের পর আগরতলা হয়ে কলকাতা চলে যান এবং সাংস্কৃতিক দলে যোগ দিয়ে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন।

স্বাধীনতার পর টেলিভিশন পুনর্গঠন

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর সেনাবাহিনীর বিমানে দেশে ফিরে টেলিভিশন পুনর্গঠনে লেগে যান। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গানে বাধা ছিল, লোকগান প্রচারে বাধা ছিল। তিনি বাংলাদেশ টিভিতে এসব অন্তর্ভুক্ত করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব প্রচারের অনুষ্ঠান শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ ও মুনীর চৌধুরীর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ (শেকসপিয়রের ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’ অবলম্বনে) নাটক নির্মাণ করেন, যা টিভি নাটকের ইতিহাসে ধ্রুপদি হিসেবে স্থান পায়। এই দুটি নাটক যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’র জন্য মনোনীত হয়েছিল। ১৯৭২ সালে ‘নতুন কুঁড়ি’ অনুষ্ঠানের রূপকারও তিনি।

পাপেট শিল্পের বিকাশ

ছোটবেলা থেকেই কার্টুন ও পাপেটের প্রতি আগ্রহ ছিল। হুগলি ও বাঁকুড়ায় পাপেট দেখার অভিজ্ঞতা এবং কলকাতা আর্ট কলেজে রাজস্থানি পাপেট দেখার অভিজ্ঞতা কাজে দেয়। টিভিতে যোগ দেওয়ার আগে ঢাকা আর্ট কলেজে পাপেট নিয়ে কাজ করেন। টিভির জন্য উপযোগী পাপেট তৈরি করতে কারিগরি কৌশল যুক্ত করেন। ১৯৬৬ সালে ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ নামে দুটি পাপেট চরিত্র সৃষ্টি করেন, যা দিয়ে পাকিস্তানিদের বিরোধী অবস্থান ব্যঙ্গ করেন। এই অনুষ্ঠান তিন বছর চলে। স্বাধীনতার পর ‘পারুল’ নামে একটি কেন্দ্রীয় পাপেট চরিত্র তৈরি করেন, যা থেকে পরে ‘মীনা’ কার্টুন চরিত্রের উদ্ভব হয়।

আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও সাফ গেমস

দ্বিতীয় ও ষষ্ঠ সাফ গেমসের উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান পরিচালনা ও ভিজুয়ালাইজারের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৫ সালে ‘সার্ক সন্ধ্যা’ অনুষ্ঠান তাঁর নির্দেশনায় হয়, যেখানে নৃত্য ও সংগীত পরিচালনাও তিনি করেন। ২০১০ সালে একাদশ সাফ গেমসের মাসকট ‘কুটুম’ দোয়েল পাখিটি তাঁর তৈরি এবং উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠানের মঞ্চ নির্মাণ ও প্রোডাকশন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন।

শেষ কথা

চিত্রকলা দিয়ে শুরু করা মুস্তাফা মনোয়ার আজ পাপেটের ‘লোক’। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি কেবল চিত্রকলায় সীমাবদ্ধ নয়। পারফর্মিং আর্টের মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক বোধকে জাগিয়ে তোলা যায়, সেই চেষ্টাই সারা জীবন করে গেছি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই চিত্রকলা আমাকে সাহায্য করেছে।’