পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার আড়মবাড়িয়া বাজারে একটি মিষ্টির দোকান। কোনো সাইনবোর্ড নেই, তবুও এলাকায় 'কড়ি পালের মিষ্টির দোকান' নামেই পরিচিত। চার ভাই—কড়ি পাল, সুকুমার পাল, হরেকৃষ্ণ পাল ও মন্টু পাল—মিলে এই দোকান চালান। বাবা গোপীনাথ পাল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মারা যাওয়ার পর থেকে চার দশক ধরে এই দোকানই তাঁদের জীবিকা।
দোকানের বিশেষত্ব ও দইয়ের চাহিদা
বাজারে মোট পাঁচটি মিষ্টির দোকান থাকলেও কড়ি পালের মিষ্টি এক নামে চলে। বিশেষ করে দইয়ের জন্য আগাম বায়না দিতে হয়। দোকানে দই খুচরা বিক্রি কম হয়; বায়নার বাইরে যেটুকু থাকে, তাড়াতাড়ি বিক্রি হয়ে যায়। কড়ি পাল জানান, যতটুকু বায়না পান, ততটুকুই তৈরি করেন। চাহিদামতো দুধ না পাওয়ায় বেশি দই বানাতে পারেন না।
দোকানে সাদা মিষ্টি ২৬০ টাকা কেজি বিক্রি হয়। মন্টু পাল জানান, স্থানীয় বাজার বলে দাম বেশি পান না। তবে অনুষ্ঠানের বায়না সবই এই দোকান থেকে যায়। এমনকি সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিনের বাড়ির মিষ্টিও এখান থেকে যায়।
চার ভাইয়ের জীবন ও ঐক্য
কড়ি পালের বয়স ৮০ ছুঁই ছুঁই। তাঁর ছোট ভাই সুকুমার, হরেকৃষ্ণ ও মন্টু। তাঁদের বাড়ি আড়মবাড়িয়া গ্রামে। সকালে কড়ি দোকান খোলেন, মন্টু পরোটা ভাজেন, সুকুমার ও হরেকৃষ্ণ খদ্দের সামলান। আরও দু-তিনজন কর্মচারী রয়েছেন। হরেকৃষ্ণের বন্ধু আসমত আলী যাত্রাপালা করতেন, তিনি সময় পেলে বন্ধুত্বের টানে দোকানের কাজে হাত লাগান।
চার ভাইয়ের সংসারে কড়ির দুই মেয়ে, সুকুমারের দুই ছেলে, হরেকৃষ্ণের দুই মেয়ে, মন্টুর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। সবাই সন্তানদের বিয়ে দিয়েছেন। মন্টুর ছেলে এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্নশিপ শেষ করেছেন। সুকুমারের দুই ছেলে লেখাপড়া করে বিয়ে করেছেন, তাঁরা বাড়িতেই থাকেন।
ব্যবসা ও মন্দাভাব
বর্তমানে ব্যবসায় মন্দা চলছে। মন্টু পাল বলেন, এখন খদ্দের কম। চিনির দোকানে ও আটার দোকানে বাকি পড়েছে। সামনে কোনো উৎসব না এলে এই মন্দা কাটবে না। তবে চার ভাই এত দিন একসঙ্গে আছেন, কোনো দিন ঝগড়া–বিবাদ হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই দোকান ছাড়া আর কোনো সম্পত্তি নেই। এ নিয়ে কোনো দিন দু–কথা হয়নি।’
ক্রেতাদের ভিড়
দোকানে দই নিতে এসেছিলেন বেসরকারি সংস্থার ব্যবস্থাপক রেশমা খাতুন (৪০)। তাঁর বাবার বাড়ি নাটোরের লালপুরের গৌরীপুর গ্রামে, শ্বশুরবাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের মাজদিয়া গ্রামে। আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাওয়ার আগে তিনি দই নিতে এসেছিলেন, কিন্তু পেলেন না—বায়না করা লোকজন সব নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত কড়ি পালের দোকান থেকে দই কিনি। দই না পেয়ে মিষ্টি নিলাম।’
পাশের বাড়ির মেহেদী খান (৩০) আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার আগে দই–মিষ্টি নিতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘কড়ি পালের দই-মিষ্টি এক নামে এলাকায় বিক্রি হয়।’
দোকানের ইতিহাস
কড়ি পালের বাবা প্রথমে এই দোকানে শুধু চা বিক্রি করতেন। ছোট ছেলে মন্টু তখন বাবার সঙ্গে থাকতেন, তাঁর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। অন্য তিন ভাই কিছুটা লেখাপড়া করেছেন। তাঁরা প্রথমে বাড়িতে মিষ্টি বানিয়ে গ্রামের হাটে হাটে বিক্রি করতেন। বাবা মারা যাওয়ার পর চায়ের দোকানে স্থায়ীভাবে মিষ্টি বেচাকেনা শুরু করেন। কড়ি পাল ও মন্টু পাল দুজনেরই পড়ে গিয়ে পা ভেঙে যায়, তাই তাঁরা দোকান ছাড়া কোথাও যেতে পারেন না। অন্য দুই ভাই দোকানের কেনাকাটার কাজে বাইরে যান।



