মেটা থিয়েটারে রাজনৈতিক হত্যা ও আত্মপরিচয়ের সংকটের নাট্যিক অভিব্যক্তি
নাট্য নির্দেশক সৈয়দ জামিল আহমেদ তাঁর নতুন মেটা থিয়েটার পরিবেশনায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গভীর সংকট ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্বকে নাট্যিকভাবে উপস্থাপন করছেন। গতকাল রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরে অবস্থিত স্পর্ধা অ্যাটেলিয়ারে এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই পরিবেশনার বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও আদি রূপকল্পের প্রতিফলন
সৈয়দ জামিল আহমেদ বলেন, "আন্তিগোনে, কবর, চাকা কিংবা বেহুলার ভাসানে লাশ সমাহিত করা হয় না। বেহুলার ভাসানে লখিন্দরের লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা আমাদের মনে এক আদি রূপকল্প হিসেবে গেঁথে আছে।" তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশে ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে নানা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, যেমন শেখ মুজিব, জিয়াউর রহমান, ফেলানী, কল্পনা চাকমা ও শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড, এই সব ঘটনার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলা জরুরি।
এই হত্যাকাণ্ডগুলোর কারণ কী এবং এই হত্যার মিছিল কেন চলছে?—এমন প্রশ্ন তিনি তাঁর নাটকে তুলে ধরছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, "আমাদের দেশে বারবার সংঘাত ঘটে যাচ্ছে, যা মূলত আত্মপরিচয়ের সংঘাত। আমরা আগে মুসলিম নাকি বাঙালি? আমাদের ভাষা আগে নাকি ধর্ম আগে? ১৯০৫ থেকে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমরা একভাবে দাঁড়ালেও, এই সংকট বারবার ফিরে আসছে, সর্বশেষ ২০২৪ সালেও ঘটেছে।"
স্মৃতি ও অতীতের সীমাবদ্ধতার প্রশ্ন
আহমেদ আরও বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর্নেস্ট রেনাঁর ‘নেশন কী’ ধারণার ভাবানুবাদ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে মানুষ অতীতের স্মৃতি রক্ষা ও সেই স্মৃতিসম্পদ নিয়ে বসবাসের ইচ্ছা পোষণ করে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, "আমরা কি আসলেই একসঙ্গে বসবাস করার ইচ্ছা পোষণ করছি? অতীতের স্মৃতি হিসেবে একাত্তরকে মনে করা যেতে পারে, কিন্তু ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর একটি মহল মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিতে চেষ্টা করেছে। আমরা কি সেটাকে মুছে ফেলব? আমরা কি ভুলে যাব?"
তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা ভুলে গেছি নীল বিদ্রোহ, সিপাহি বিপ্লব ও কৈবর্ত আন্দোলনের কথা। আমাদের অতীত যেন একাত্তর সাল পর্যন্ত সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে, একটি দলের রাজনীতির মধ্যে। আমরা তাহলে কী মনে রাখব? কত দূর পর্যন্ত মনে রাখব?" এই আত্মপরিচয়ের সংকট ও দ্বন্দ্বের ফলে বারবার লাশ পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিবেশনায় ঐতিহাসিক চিত্র ও স্মৃতিচিহ্ন
এই মেটা থিয়েটারে ৭ মার্চের ভাষণকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আহমেদ বলেন, "ভাষণটাই মুক্তিযুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন, যা শেখ হাসিনা বারবার শুনিয়ে কান ঝালাপালা করিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু চিহ্নটাকে মুছে ফেলার চেষ্টাও ভুল। আমরা ওই চিহ্নটাকে স্মরণ করতে চাই।" পরিবেশনায় জিয়াউর রহমানের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাঠ, তাজউদ্দীন আহমদের স্বপ্ন পাঠ, চার নেতার হত্যাকাণ্ড উপস্থাপন ও জুলাই আন্দোলনের শহীদদের কথা বলা হবে।
প্রজেকশনে শেখ মুজিব, সিরাজ সিকদার, জিয়াউর রহমান, নূর হোসেন, আবু সাঈদ, শরিফ ওসমান হাদিসহ অসংখ্য মৃত ব্যক্তির ছবি দেখানো হবে, সঙ্গে বেহুলার ভাসানের গান গাওয়া হবে। আহমেদ বলেন, "লখিন্দরের সেই ইমেজটাই যেন হয়ে গেছে শেখ মুজিবের লাশ ভাসা, জিয়াউর রহমানের লাশ ভাসা, মুক্তিযোদ্ধাদের লাশ ভাসা, ধর্ষণের শিকার নারীদের লাশ ভাসা—সব জায়গা থেকেই আমরা এই আদি রূপকল্পটাকে ব্যাখ্যা করতে চাই।"
শিল্পকলা একাডেমিতে বাধা ও ঝুঁকির কথা
সৈয়দ জামিল আহমেদ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে বলেন, "ডিসিরা নানাভাবে আমাকে কাটিয়ে গেছে, সিরাজগঞ্জ ও খুলনায় কাজ আটকে দিয়েছে। তারা বলেছিল, গোয়েন্দা প্রতিবেদন আছে, সমস্যা হতে পারে।" তিনি আরও যোগ করেন, "মন্ত্রণালয় থেকেও বারবার বাধা এসেছে, শিল্পকলা একাডেমির স্বায়ত্বশাসনের জন্য একটি নতুন প্রস্তাব তৈরি করেছিলাম, কিন্তু মন্ত্রণালয়ের প্রধান তা স্বাক্ষর করেননি।"
শিল্পকলা একাডেমির অভ্যন্তরে বিভাজনের কথাও তিনি উল্লেখ করেন: "একদল আওয়ামী লীগের পক্ষে, আরেক দল বিএনপির পক্ষে। কেউ গণ–অভ্যুত্থানের পক্ষে, কেউ তার বিপক্ষে। একধরনের মারমুখী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।" তিনি বলেন, "প্রথম আলোতে মব আগুন দিয়েছে, একইভাবে শিল্পকলা একাডেমিতেও আগুন দেওয়া হতে পারত। শিল্পকলার স্বার্থে আমি তখন নাটকটা বন্ধ করতে বাধ্য হই।"
স্পর্ধার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলা
বর্তমানে স্পর্ধার সঙ্গে কাজ করে নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলাই তাঁর মূল লক্ষ্য। আহমেদ বলেন, "শিল্পকলা ছাড়ার পর থেকে আমরা নতুনদের নিয়ে উৎসব করেছি, ওয়ার্কশপ করেছি, একটি স্টুডিও ও একাডেমি তৈরি করেছি।" তিনি জানান, মেটা থিয়েটারের পর আরেকটি মেটা থিয়েটার, প্যারাথিয়েটার ও হাসির নাটক করার পরিকল্পনা আছে, এবং ভবিষ্যতে আন্তিগোনে নাটক মঞ্চস্থ করার আশা প্রকাশ করেন।
শিল্পকর্মের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, "শিল্পকর্মের কাজ হচ্ছে প্রশ্ন তোলা এবং মানুষকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলা। কোনো ছবি যদি আপনাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য না করে কিংবা অস্বস্তি তৈরি না করে, তাহলে সেই শিল্পকর্মের মানে কী?" তিনি শাহাবুদ্দিন আহমেদের আঁকা শেখ মুজিবের মৃত অবস্থার ছবির উদাহরণ দিয়ে বলেন, "ওই ছবি আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে, এবং ঝুঁকি আছে বলেই এখন তা টাঙানো হয় না।"
