চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ত এলাকা শুলকবহরে ছিল কর্ণফুলী নদীর প্রবাহ। সেখানে ভিড়ত জাহাজ। ক্রমে নদী সংকুচিত হয়ে পরিবর্তিত হয়েছে নদীর গতিপথ। বর্তমানে এই এলাকা থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী নদী।
ব্রিটিশবিরোধী ডাকাতি ও সুলকবহর হাউজ
১৩ ডিসেম্বর, ১৯২৩, আনুমানিক সকাল ১০টা। নির্জন টাইগার পাস এলাকা পেরিয়ে চট্টগ্রাম কোর্ট ট্রেজারি থেকে টাকা নিয়ে পাহাড়তলীর আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কারখানার দিকে যাচ্ছিল ইংরেজদের একটি ঘোড়ার গাড়ি। আচমকাই হামলা করেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী নেতারা। মুহূর্তেই লুট হয়ে যায় ১৭ হাজার টাকা। অভিযান শেষে তাঁরা ফিরে আসেন নিজেদের হেডকোয়ার্টার—‘সুলকবহর হাউজে’।
বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার তাঁর ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘ডাকাতির সতর হাজার টাকার মধ্যে বেশীর ভাগ কলিকাতায় বিপ্লবী সহযোগীদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়…বাকী অর্থ নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য ফেরারী দেবেন দে এবং এই ডাকাতিতে অংশগ্রহণকারী…বিপ্লবী নেতারাও শহরের উপকণ্ঠে সুলকবহরে এক পরিত্যক্ত ও পুরাতন বাড়ীতে আশ্রয় গ্রহণ করেন।’
শুলকবহরের প্রাচীন ইতিহাস
তখনকার সুলকবহর বা শুলকবহর ছিল শহরের একেবারে শেষ প্রান্ত। শহরের গায়ে লেগে থাকা এক নীরব সীমান্ত এলাকা। আজ এটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ১২ বর্গকিলোমিটারের একটি প্রশাসনিক ওয়ার্ড। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, এই নামের ভেতর লুকিয়ে আছে আরও বহু পুরোনো সময়। কর্ণফুলী নদীর পুরোনো গতিপথ, আরব বণিকদের নৌবাণিজ্য, হারিয়ে যাওয়া জাহাজঘাটা—সব মিলিয়ে শহরের বিস্তারের দীর্ঘ এক গল্প।
ইতিহাসের সেই সরু পথ ধরে হাঁটতে গেলে বাস্তব আর অতীত যেন একসঙ্গে মিশে যায়। আজকের নগরের ষোলশহর থেকে বহদ্দারহাট পর্যন্ত যে সরু হয়ে যাওয়া চশমা খাল, আর বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত বিস্তৃত চাক্তাই খাল—সবই যেন অন্য এক সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসবিদদের মতে, আজ দুই-আড়াই শ বছর আগেও এই পুরো অঞ্চলই ছিল প্রমত্ত কর্ণফুলী নদীর বিস্তৃত প্রবাহপথ। আর সেই নদীর ধারেই শুলকবহরে এসে নোঙর করত আরব বণিকদের বাণিজ্যতরি। শুলকবহর এলাকায় জাহাজ ভেড়ার প্রামাণ্য তথ্য কোথাও পাওয়া না গেলেও সে সময়কার মানচিত্রে এটি বন্দর হিসেবে চিহ্নিত আছে।
নামকরণের নানা মত
ইতিহাসবিদ চৌধুরী পূর্ণচন্দ্র দেববর্ম্মা তত্ত্বনিধি ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, এই এলাকার পূর্ব দিকে ছিল একটি বড় খাল, যেখানে জাহাজ বা ‘সুলুপ’ সারিবদ্ধভাবে রাখা হতো। পর্তুগিজ ‘সুলুপ’ আর আরবি ‘বহর’—দুটি শব্দ মিলেই নাম হয় ‘সুলুপবহর’। পরে অপভ্রংশে তা হয়ে যায় ‘শুলুকবহর’, আর সেখান থেকেই বর্তমানের ‘শুলকবহর’। ব্রিটিশ আমলে এটি জরিপভুক্ত মৌজা হিসেবে চট্টগ্রাম শহরের অংশ হয়ে ওঠে।
নামকরণের আরেকটি কাছাকাছি ব্যাখ্যা পাওয়া যায় চট্টল তত্ত্ববিদ আবদুল হক চৌধুরীর ‘বন্দর শহর চট্টগ্রাম’ গ্রন্থে। তাঁর মতে, অষ্টম ও নবম শতকে আরব বণিকেরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে নৌবাণিজ্য পরিচালনা করতেন। তখন কর্ণফুলী নদীর প্রাচীন প্রবাহ বর্তমান শুলকবহর এলাকার ওপর দিয়েই বয়ে যেত। নদীর এই অংশে এসে নোঙর করত আরব বণিকদের বাণিজ্যতরি। যে স্থানে আরব বণিকদের জাহাজ অবস্থান করত, সেই জায়গার নাম ছিল ‘সুলকুল বহর’। আরবি এই শব্দের অর্থ পোতাশ্রয় বা জাহাজের অবস্থানস্থল। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের মুখে ‘সুলকুল বহর’ বদলে যায় ‘সুলকবহর’ বা শুলকবহরে।
তবে এই নামের উৎস নিয়ে ভিন্ন মতও আছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষক আহমদ শরীফ মনে করেন, সুলকবহর আরবি ‘সুলকুল বহর’ থেকে আসেনি। তাঁর মতে, এটি পর্তুগিজ ‘সুলুপ’ শব্দ থেকে আসতে পারে। তাঁর যুক্তি, আরব বণিকেরা এখানে শাসনক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না, তাই তাদের নামে স্থানের নামকরণ হওয়ার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ।
ব্রিটিশ মানচিত্রে শুলকবহর
ইতিহাস গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাচীন মানচিত্রে বিভিন্ন রূপে শুলকবহর বা এর কাছাকাছি নামের যে উল্লেখ পাওয়া যায়, তা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের নৌবাণিজ্যিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে। ইতিহাস গবেষক হারুন রশীদ তাঁর ‘উপনিবেশ চট্টগ্রাম: ৫০০ বছরের ধারাবাহিক ইতিহাস’ গ্রন্থে সংযুক্ত একটি মানচিত্রে ‘শুলব্বার’ নামে একটি স্থানের উল্লেখ করেছেন। ১৮১৮ সালে স্কটিশ জেনারেল জন চিপ এই মানচিত্রটি অঙ্কন করেন। যেখানে তৎকালীন নদীপথ ও বাণিজ্যিক বসতির বিস্তৃত চিত্র উঠে আসে।
জন চিপের মানচিত্র অনুযায়ী, শহরের এক প্রান্ত চাক্তাই খাল ঘেঁষে চকবাজার হয়ে মুরাদপুর পর্যন্ত, আর অন্য প্রান্ত গোসাইলডেঙ্গা থেকে টাইগারপাস হয়ে ষোলশহর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। দক্ষিণে কর্ণফুলী নদী এবং উত্তরে বহদ্দারহাট পর্যন্ত এলাকাই ছিল শহরের সীমানা। প্রাচীন চট্টগ্রাম শহর গড়ে উঠেছিল চাক্তাই খালের পশ্চিম তীরে। পূর্বতীর তখন ছিল চরাঞ্চল।
হারুন রশীদ তাঁর বইতে জরিপবিদ ও প্রকৌশলী মেজর জেমস রেনেলের একটি মানচিত্রের কথাও লিখেছেন। ১৭৭৬ সালের ওই মানচিত্রে ‘সুলাবের’ নামে কর্ণফুলী নদীর তীরে একটি এলাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। মানচিত্রের ব্যাখ্যায় হারুন রশীদ লিখেছেন, ‘ব্রিটিশ আমলের সূচনালগ্নেও কর্ণফুলী নদী বর্তমানের কয়েক গুণ বেশি প্রশস্ত ছিল। মোগল আমলে কত বড় ছিল, তা এখান থেকেও অনুমান করা সম্ভব।’
কর্ণফুলীর গতিপথ পরিবর্তন ও নগর বিস্তার
শুলকবহরের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্ণফুলী নদীর গতিপথের পরিবর্তন, প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র এবং নগর বিস্তারের ধারাবাহিকতা। ইতিহাসবিদদের মতে, আজকের স্থলভাগ একসময় ছিল নদীতীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যাঞ্চল। কর্ণফুলীর বিস্তৃত প্রবাহ, জাহাজ চলাচল এবং নদীকেন্দ্রিক বাজারব্যবস্থা শুলকবহরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। পরে নদীর গতিধারা বদলে গেলে এই ভূগোলও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়।
শুলকবহর যে বণিকদের পোতাশ্রয় ছিল, তার আরেকটি ব্যাখ্যাও দিয়েছেন আবদুল হক চৌধুরী। তাঁর মতে, সুলকুল বহরের পশ্চিম পাশে কর্ণফুলী নদীর তীরে ছিল আরেকটি বাণিজ্যকেন্দ্র, যেখানে আমদানি করা পণ্য এবং স্থানীয় রপ্তানিযোগ্য পণ্য কেনাবেচা হতো। সেই জায়গার নাম ছিল ‘চাহেলে শহর’। আরবি এই নামের অর্থ নদীতীরবর্তী শহর। পরে লোকমুখে ‘চাহেলে শহর’ বদলে যায় ‘ষোলশহর’-এ।
আবদুল হক চৌধুরী আরও উল্লেখ করেন, সময়ের সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর গতিধারায় বড় পরিবর্তন আসে। নদী ধীরে ধীরে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সরে যায়। ফলে পুরোনো নদীপথ ভরাট হতে থাকে এবং সেখানে নতুন জনবসতি গড়ে ওঠে। আগে যেখানে নদীর পানি ছিল, পরে সেখানে তৈরি হয় মৌজা ও আবাসিক এলাকা। এভাবেই ‘সুলকুল বহর’ একটি স্থলভাগের নাম হিসেবে টিকে যায় এবং পরে প্রশাসনিকভাবে ‘সুলকবহর’ মৌজা হিসেবে পরিচিত হয়।
কর্ণফুলী নদী হয়েই আরব বণিকেরা তাঁদের বাণিজ্যতরি নিয়ে শুলকবহরে আসত বলে মনে করেন ইতিহাস গবেষক হারুন রশীদ। তিনি বলেন, ‘জন চিপের মানচিত্র ছাড়া আরও কয়েকটি প্রাচীন মানচিত্র অনুযায়ী দেখা যায়, এখন যেটি চাক্তাই খালের সীমানা, সেটি ছিল কর্ণফুলী নদীর পাড়। বহদ্দারহাট-শুলকবহর ছিল তখন নদীর তীরবর্তী এলাকা। বাকলিয়া পুরো এলাকাটিই কর্ণফুলী নদীর অংশ ছিল। সেই নদীপথেই বণিকেরা শুলকবহরে আসত।’
ইতিহাস বলছে, টাইগার পাসে ইংরেজদের লুটের পর বিপ্লবীরা যে আশ্রয়ে ফিরেছিলেন, সেই ‘সুলকবহর হাউজ’ আজকের শুলকবহরের ইতিহাসকে অন্য মাত্রা দেয়। তবে এ এলাকার পরিচয় আরও পুরোনো। কালের প্রবাহে কর্ণফুলীর স্রোত বদলেছে। নদী সরে গেছে, খাল সরু হয়েছে, জাহাজঘাটাও হারিয়ে গেছে। কিন্তু নামের ভেতর আজও রয়ে গেছে সেই ইতিহাস।



