দেবব্রত বিশ্বাস: প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে এক অটল রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী
দেবব্রত বিশ্বাস: প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে অটল শিল্পী

দেবব্রত বিশ্বাসের সমগ্র সংগীতজীবনের সারসত্য ছিল তাঁর নিজের কথায়: "যে রবীন্দ্রনাথের সংগীতচিন্তা আমার চিন্তাধারার ওপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেই রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ অমান্য করে, নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে মাঝারি কর্তাদের বিধিনিষেধ মেনে আর রবীন্দ্রসংগীত রেকর্ড করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই, প্রবৃত্তিই নেই।" তিনি প্রতিষ্ঠানের চোখে ব্রাত্য হলেও মানুষের কাছে ছিলেন অনিবার্য। তাঁর ভরাট কণ্ঠ, স্বতন্ত্র গায়কি ও আবেগময় পরিবেশনায় রবীন্দ্রসংগীতকে বাঙালি মধ্যবিত্তের সংকীর্ণ সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে দেন এক অনন্য উচ্চতায়।

জন্ম ও শৈশব: সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বীজ

১৯১১ সালের ২২ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার বরিশালে এক ব্রাহ্ম পরিবারে দেবব্রত বিশ্বাসের জন্ম। বাবা দেবেন্দ্রকিশোর বিশ্বাস ও মা অবলাদেবী। পিতৃপুরুষের ভিটা ছিল কিশোরগঞ্জের ইটনা গ্রামে। তাঁর ঠাকুরদা ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করায় গ্রাম থেকে বিতাড়িত হন; সেই বিতাড়নের উত্তাপ পরবর্তী প্রজন্মেও পোহাতে হয় দেবব্রতকে। রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের চোখে তিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ'। শৈশবের এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও অপমান পরবর্তী জীবনে অন্যায় ও সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছিল তাঁকে। 'জর্জ' নামেই তিনি সর্বাধিক পরিচিত—জন্মের সময় ইংল্যান্ডের সিংহাসনে ছিলেন পঞ্চম জর্জ, সেই অনুষঙ্গেই বাবা এই নামটি রেখেছিলেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

শিক্ষা ও সংগীতের সূচনা

কিশোরগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, আনন্দমোহন কলেজ হয়ে কলকাতা সিটি কলেজে আই.এ., তারপর বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ পাস করেন। ১৯৩৪ সালে হিন্দুস্থান ইনসিওরেন্স কোম্পানিতে যোগ দেন, যা পরে জীবনবিমা নিগম নামে পরিচিতি পায়; সেখান থেকে ১৯৭১ সালে অবসর নেন। সংগীতে কোনো প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না তাঁর—মায়ের কণ্ঠে ব্রহ্মসংগীত ও রবীন্দ্রসংগীত শুনতে শুনতে বেড়ে ওঠা। ১৯২৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের শতবার্ষিকী উৎসবে প্রথমবার রবীন্দ্রনাথকে দেখেন। রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নিবিড় পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীর হাত ধরে। পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতে পিয়ানোর সাহচর্যে রবীন্দ্রসংগীতের ভেতরের আলোটুকু অনুভব করতে শিখলেন।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

প্রথম রেকর্ড ও বামপন্থী প্রভাব

বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ শৈলজারঞ্জন মজুমদারের পরিচালনায় কনক দাসের সঙ্গে এইচএমভি থেকে প্রকাশিত "সংকোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান" এবং "হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব"—গান দুটির মাধ্যমে প্রথম দ্বৈত রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ডের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু। ১৯৩৮ সালে পিতৃবিয়োগ ও তীব্র আর্থিক অনটনের মধ্যেই দেবব্রতর জীবনচেতনা বামপন্থার দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বাংলায় গড়ে ওঠা প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মঞ্চে তিনি নিয়মিত গাইতে শুরু করেন স্বদেশি গান ও রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক গান। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় কবি জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের লেখা গানে সুরারোপ করেন দেবব্রত—ঐতিহাসিকভাবে যার নাম 'নবজীবনের গান'। দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেন সেই গান।

সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও দেশভাগের ক্ষত

বিজন ভট্টাচার্যের নাটক 'নবান্ন' এবং গণনাট্য সংঘের ছায়ানাটক 'শহীদের ডাক'-এর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রথম সারির সৈনিক। পণ্ডিত রবিশঙ্কর, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মতো প্রতিভাধর মানুষদের সঙ্গে এই সময়েই গড়ে ওঠে গভীর বন্ধুত্ব। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় গণনাট্যের তরুণ গায়ক কলিম শরাফীকে নিজের ঘরে লুকিয়ে রেখে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে—যে পূর্ববঙ্গের মাটিতে জন্ম ও শৈশব, তা রাতারাতি 'বিদেশ' হয়ে যাওয়া তিনি মানসিকভাবে মেনে নিতে পারেননি।

প্রাতিষ্ঠানিক দ্বন্দ্ব ও আপসহীন সংগ্রাম

১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীতে নতুন রেকর্ডের মাধ্যমে রাজকীয় প্রত্যাবর্তনের পর জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছান দেবব্রত। কিন্তু ১৯৬৪ সাল থেকে বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তীব্র আকার নেয়। বোর্ড একের পর এক রেকর্ড অননুমোদিত করতে থাকে—কখনো অতিরিক্ত বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের অভিযোগে, কখনো গানের গতি নিয়ে, কখনো স্বরলিপির প্রশ্নে। কিন্তু ঠিক কোথায় কী ভুল, তা কখনো স্পষ্ট করা হয়নি। বিচারটি ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতিনির্ভর, কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ১৯৭৪ সালে বোর্ডের সেক্রেটারিকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে দেবব্রত রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাই তুলে ধরেন। গায়কের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ দিলীপকুমার রায়কে বলেছিলেন, "গানের গতি অনেকখানি তরল, কাজেই তাতে গায়ককে খানিকটা স্বাধীনতা তো দিতেই হবে।" আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কথাটি তিনি তুলে ধরলেন— "সরস্বতীকে শিকল পরাইলে চলিবে না... সংসারে কেবল মাঝারির রাজত্বেই এমন নিদারুণতা সম্ভব।"

শেষ সম্ভাবনার ক্ষয়

১৯৭৭ সালে বোর্ড কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি আর আগের জায়গায় ফেরেনি। দেবব্রত তখন জানান, বোর্ডের পরীক্ষকরা বয়সে ও অভিজ্ঞতায় তাঁর চেয়ে কম—তাদের হাতে নিজের ব্যাখ্যা ও প্রকাশের স্বাধীনতা তুলে দিতে রাজি নন তিনি। তিনি চেয়েছিলেন বিশ্বস্ত বন্ধু জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রকে রেকর্ড অনুমোদনের দায়িত্ব দেওয়া হোক। কিন্তু ২৫ অক্টোবর ১৯৭৭-এ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র প্রয়াত হন—বন্ধ হয়ে যায় শেষ সম্ভাবনাটুকুও। বোর্ডের অনুমোদন না পেয়ে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে রচিত নিজের 'গুরু বন্দনা' গানটিও প্রকাশ করতে পারেননি তিনি। পাহাড়সম বেদনার ভার বুকে নিয়ে ১৯৮০ সালে লিখলেন— "কে রে হেরা আমারে গাইতে দিল না।"

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বদেশে স্বজনদের লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ও সুরে দুটি গান রেকর্ড করেন দেবব্রত বিশ্বাস। ওপার বাংলার জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশেও একাধিকবার এসে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেছেন।

মৃত্যু ও উত্তরাধিকার

জীবনের শুরুতে যিনি ছিলেন 'ম্লেচ্ছ', শেষ জীবনে নিজেই বললেন রবীন্দ্রসংগীত জগতে তিনি হয়ে গেছেন 'হরিজন'। ১৯৮০ সালের ১৮ আগস্ট, ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় দেবব্রত বিশ্বাসের দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে। দেবব্রত বিশ্বাস আজও প্রথাবিরোধী মানুষের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর শিল্পীস্বাধীনতার এক অবিনশ্বর নাম—সফদার হাশমির মতো তাই দেবব্রত বিশ্বাসকে নিয়েও একই কথা বলা যায়, দেবব্রত বিশ্বাস মানে জাগা, জেগে থাকা, জাগানো।